EMail: corporatenews100@gmail.com
যুক্তরাষ্ট্রে জুনে কর্মসংস্থান প্রত্যাশার চেয়ে কম, সতর্ক নিয়োগদাতারা
বিশ্বকাপ চললেও কমেছে হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের চাকরি
কর্পোরেট নিউজ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে ধীরগতির প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জুন মাসে দেশটির নিয়োগদাতারা মাত্র ৫৭ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি করেছেন, যা আগের মাসের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। এতে বোঝা যাচ্ছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ভোক্তা আস্থা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও নতুন কর্মী নিয়োগে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জুনে বেকারত্বের হার ৪.৩ শতাংশ থেকে কমে ৪.২ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এই উন্নতির বড় কারণ নতুন কর্মসংস্থান নয়; বরং অনেক বেকার ব্যক্তি চাকরি খোঁজা বন্ধ করে দেওয়ায় তারা আর সরকারি হিসাবের বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে নেই।
নিয়োগ বাড়লেও গতি এখনও দুর্বল
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রতি মাসে ৯২ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এটি উন্নতি হলেও শ্রমবাজার এখনও প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।
এর আগে এপ্রিল ও মে মাসে প্রকাশিত কর্মসংস্থানের প্রাথমিক তথ্যও পরে সংশোধন করে কমিয়ে আনা হয়েছে। মে মাসে প্রথমে ১ লাখ ৭২ হাজার নতুন চাকরির কথা জানানো হলেও সংশোধিত হিসাবে তা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজারে। একইভাবে এপ্রিলের চাকরি বৃদ্ধির সংখ্যা ১ লাখ ৭৯ হাজার থেকে কমিয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও অনিশ্চয়তায় নিয়োগে সতর্কতা
চাকরির ওয়েবসাইট ZipRecruiter-এর শ্রম অর্থনীতিবিদ নিকোল বাশো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার এখনও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
তার মতে, নিয়োগদাতা এবং চাকরিপ্রার্থীরা—উভয় পক্ষই বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন চাকরির বিজ্ঞাপন দিলেও সেসব পদ দ্রুত পূরণ করছে না।
বিশ্বকাপ চললেও কমেছে হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের চাকরি
বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হলেও প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি।
জুন মাসে—
- রেস্তোরাঁ, বার ও হোটেল খাতে ৬১ হাজার চাকরি কমেছে।
- খুচরা (Retail) খাতে ৭,৫০০ কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে।
ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ চ্যাড মাউট্রে বলেন, মধ্য ও নিম্ন আয়ের ভোক্তারা বাইরে খাওয়ার খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন। ফলে রেস্তোরাঁ ব্যবসা চাপের মুখে পড়েছে।
তার ভাষায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি অর্থনীতি তৈরি হয়েছে যেখানে উচ্চ আয়ের মানুষ তুলনামূলক স্বাভাবিক ব্যয় করছেন, কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
AI কি চাকরি কমাচ্ছে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চাকরি কেড়ে নেবে—এমন আশঙ্কা থাকলেও সর্বশেষ তথ্য ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।
জুন মাসে Professional and Business Services খাতে ৩৬ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। এই খাতে সফটওয়্যার উন্নয়ন, প্রকৌশল, স্থাপত্য এবং বিভিন্ন পেশাদার সেবা অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, AI-সম্পর্কিত প্রযুক্তি ও সেবার বিস্তারের কারণে এই খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
AI অবকাঠামোতে বাড়ছে নির্মাণ খাতের কর্মসংস্থান
জুনে নির্মাণ খাতে ১১ হাজার এবং উৎপাদন খাতে ৩ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং AI প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণের কারণে এই খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক Power & Construction Group ইতোমধ্যে গত দুই মাসে ৪৭ জন নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে এবং আরও ১৫ থেকে ২০ জন নিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মতে, AI-চালিত ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ গ্রিড সম্প্রসারণে দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, শ্রমিক ও ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালকদের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে ফেডারেল রিজার্ভ
সর্বশেষ কর্মসংস্থান প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে, চাকরি ও মজুরি বৃদ্ধির গতি এখনও এতটা শক্তিশালী নয় যে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
এ কারণে অনেক অর্থনীতিবিদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Federal Reserve) আপাতত সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর মার্কিন শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় এবং S&P 500 সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়।
মজুরি বাড়লেও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না
গত এক বছরে গড় মজুরি ৩.৫ শতাংশ বেড়েছে।
তবে খাদ্য, জ্বালানি, বাসস্থানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য আরও দ্রুত বাড়ায় প্রকৃত অর্থে অনেক পরিবার এখনও ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
শ্রমবাজার থেকে সরে যাচ্ছেন অনেকেই
জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বা চাকরি খুঁজছেন—এমন মানুষের হার কমে ৬১.৫ শতাংশে নেমেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এর একটি বড় কারণ দ্রুত বাড়তে থাকা অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা। প্রতিদিন ১০ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিক ৬৫ বছর বয়সে পৌঁছাচ্ছেন এবং অনেকেই চাকরি থেকে অবসর নিচ্ছেন।
তবে ২৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও কিছুটা কমেছে, যা শ্রমবাজারের জন্য উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
জুনের কর্মসংস্থান প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার এখনও সতর্ক ও ধীরগতির। একদিকে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন নিয়োগে সংযত করছে, অন্যদিকে AI ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ কিছু নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং ভোক্তা ব্যয়ের প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার কোন দিকে যাবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: AP News