EMail: corporatenews100@gmail.com
আমদানিনির্ভরতার ফাঁদে জ্বালানি খাত: গ্যাস সংকটে অর্থনীতি ও বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা ও সার কারখানার প্রাণশক্তি গ্যাস। অথচ সেই গ্যাস নিয়েই এখন গভীর সংকটে দেশ। এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই ধীরে ধীরে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন উপেক্ষিত হতে থাকে। এর পরিবর্তে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতিই প্রধান কৌশল হিসেবে অনুসরণ করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই নীতি এখন বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, অথচ সরবরাহ মিলছে মাত্র ২৫৮ কোটি ঘনফুটের মতো। ফলে প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে ১২২ কোটি ঘনফুটের বেশি। শুধু তাই নয়, এক বছর আগের তুলনায় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন ও রফতানি খাতে।
স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। দেশে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে চারটির উৎপাদন গত এক বছরে কমেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স ও বিজিএফসিএলের উৎপাদন যেমন কমেছে, তেমনি দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদক বিদেশী কোম্পানি শেভরনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে। যেসব গ্যাসক্ষেত্র একসময় জাতীয় গ্রিডের ভরসা ছিল, সেগুলো এখন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হওয়ার পথে।
এই ঘাটতি সামাল দিতে সরকার ক্রমেই বেশি করে নির্ভর করছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিগত কয়েক বছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয়ের অংক দাঁড়িয়েছে কয়েক লাখ কোটি টাকায়। ফলে জ্বালানি খাতের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজিনির্ভর এই ব্যবস্থা শুধু ব্যয়বহুলই নয়, একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক রাজনীতি, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সরবরাহ চেইনের সামান্য বিঘ্নও বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যে তার ইঙ্গিত মিলেছে এলপিজি বাজারে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও জাহাজ সংকটে দেশে এলপিজির সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে শিল্পখাত পর্যন্ত।
এমন বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল, তারা জ্বালানি খাতে একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক কৌশল নেবে। যাতে আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে এবং স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে গতি আসে। কিন্তু ব্যবসায়ী ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে তেমন কার্যকর পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং গ্যাসের সংকট আগের চেয়ে আরও প্রকট হয়েছে।
জ্বালানি খাতের ভেতরের অনেকে মনে করেন, বিগত সরকারের সময়ে এলএনজি আমদানিকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। এর ফলে স্থানীয় অনুসন্ধান কার্যক্রম কার্যত থমকে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলেও সেই কাঠামোগত দুর্বলতা ভাঙতে পারেনি। নতুন কূপ খননের কথা বলা হলেও তার প্রভাব এখনো সরবরাহে দৃশ্যমান নয়।
বর্তমানে দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু এই অবকাঠামো দিয়ে চাহিদার পুরোটা মেটানো সম্ভব নয়। নতুন ভাসমান বা স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে সময় লাগবে কয়েক বছর। ফলে স্বল্পমেয়াদে সংকট কাটার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ পরিবেশে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যেকোনো প্রকল্পে আসার আগে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখেন। অথচ দেশে বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। অনেক শিল্প-কারখানা বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমাচ্ছে বা বন্ধ করে দিচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান, রফতানি আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে স্বল্পমেয়াদি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন। ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এমন একটি রোডম্যাপ দরকার, যা সরকার পরিবর্তন হলেও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে।
সরকার বলছে, সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনার আওতায় ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে জ্বালানি খাত সংস্কার করা হবে। এই পরিকল্পনায় বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। তবে বাস্তবতা হলো—এই পরিকল্পনার সুফল পেতে সময় লাগবে, আর বর্তমান সংকট মোকাবেলায় তাৎক্ষণিক সমাধান এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি খাত এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, আমদানিনির্ভর নীতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলে গ্যাস সংকটকে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত করেছে। এই সংকট কীভাবে মোকাবেলা করা হবে, তার ভার এখন পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাঁধেই গিয়ে পড়ছে।