EMail: corporatenews100@gmail.com
বুলগেরিয়ার ডাক্তার নামে খ্যাত – ডা: সরওয়ার আলম, এমবিবিএস। তিনি ডাক্তারি পাশ দিয়েছেন বুলগেরিয়ায়। অনেকে আদর করে তাঁকে ‘গরীবের ডাক্তার’ বা ‘দু’টাকার ডাক্তার’ নামেও ডাকেন। তবে এখন তিনি আর রোগী দেখেন না। বসবাস করছেন এলাকার এক বিচ্ছিন্ন বেড়ার ঘরে। বলাযায় অনেকটা নির্বাসিত-সন্ন্যাস জীবন যাপন করছেন।
সভ্যতার খসেপড়া পলেস্তারায় গড়েউঠা সমাজ ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে তিনি এখনো গরমে হাতপাখা চালিয়ে, অন্ধকারে হারিকেন জ্বালিয়ে দিন কাটান। ঘরের সামনে নানারকম ভেষজ উদ্ভিদের বাগান। প্রকৃতির কোলে একাকী থাকা, নিজেকে আড়াল রাখাই তাঁর পছন্দ। পরিচিত-অপরিচিত কারোর সঙ্গেই তেমন কথা বলেন না। তবু বিশেষ অনুরোধে মাঝে মাঝে রোগী দেখেন। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই নিখুঁত রোগ নির্ণয় করে ফেলেন। সামান্য ওষুধেই রোগী সুস্থ হয়ে উঠে। তাতেই স্থানীয় জনপদ চমকে যায়। এরকম একটা খ্যাতি পুরো চকরিয়া ও কক্সবাজারজুড়ে ছড়িয়ে আছে। বহু মানুষ এখনো জীবনের শেষ চিকিৎসা মনে করে তাঁর কাছে ছুটে আসে।

পোড়খাওয়া বৈচিত্র্যময় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি অসাধারণ কিছু কবিতা রচনা করেছেন। জানা যায়, আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও, প্রকাশকের অভাবে এখনও কোন কবিতার বই প্রকাশিত হয়নি। বর্তমানে তিনি একজন প্রকাশক খুঁজছেন।”
এমন ছন্নছাড়া মেধাবী মানুষটি একসময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের একজন ছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে দুর্দান্ত মেধা নিয়ে ভর্তি হন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে। সত্তরের দশকে এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় বোর্ডস্ট্যান্ড করে পুরো এলাকায় আলোড়ন তোলেন। তাঁর ভাগ্নীজামাই, সাবেক শিক্ষা অফিসার কুতুবদিয়ার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছেন, পৃথিবীতে এমন মেধাবী ও প্রতিভাবান মানুষের দেখা বিরল ঘটনা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, তাকে বিরল মেধা ও প্রতিভা দেন। সেই প্রতিভার ছাপ স্পষ্ট দেখা যায় ডা: সরওয়ার আলমের মধ্যে।
সরওয়ার আলমের বাবা মরহুম আব্দুল খালেক ছিলেন চকরিয়ার একজন নামকরা পরহেজগার বিশিষ্ট আলেম-এ দ্বীন। মা ছিলেন রত্নগর্ভা নারী। পরিবারে ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনরা সবাই মেধাবী ও কীর্তিমান। কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার ভরামুহুরী গ্রামে জন্ম ও বেড়েউঠা সরওয়ার আলম ছিলেন বিরল মেধা ও প্রতিভার অধিকারী। তাঁকে আল্লাহ সমস্ত বুদ্ধি, মেধা ও মননশীলতা দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—আজ তিনি নানা কষ্টে ভুগছেন। জাগতিক সকল লেনা-দেনার কোলাহল থেকে নিজেকে আড়াল করেছেন। আর জাতি বঞ্চিত হচ্ছে তাঁর অমূল্য চিকিৎসাসেবার।
ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে চিকিৎসাশাস্ত্রে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সরওয়ারের মেধা স্পষ্ট। তিনি বুলগেরিয়ার সোফিয়া মেডিকেল একাডেমীতে ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষকরা নিশ্চিত ছিলেন, তিনি একজন অসাধারণ চিকিৎসক হবেন। কিন্তু তিনি জ্ঞানের পরিধিকে শুধুমাত্র চিকিৎসাশাস্ত্রে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তৎকালীন বিশ্ব প্রেক্ষাপট—সমাজতন্ত্র বনাম ধনতন্ত্রের সংঘর্ষ—তাঁকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে মগ্ন করে তোলে। বলিভিয়ার ডাক্তার ও বিপ্লবী চে গুয়েভরা, কিউবার কিংবদন্তী বিপ্লবী ফিডেল ক্যাস্ট্রো, চিলির আলেন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সরওয়ার আলম সমাজতান্ত্রিক চিন্তায় নিমগ্ন হন।
তিনি পড়েছেন কার্ল মার্ক্স, হেগেল, মাও সেতুং, হো চি মিন, লেনিন-এর সাহিত্য। সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, সভ্যতার ইতিহাস, বিশ্ব ইতিহাস ও বিশ্ব সাহিত্য—সর্বত্র তাঁর মনোযোগী অধ্যয়ন। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকেও ছাড়েনি। সারাবিশ্বের তরুণ শিক্ষিত সমাজ যেমন মার্কিন-রুশ সংঘর্ষের বাইরে থাকতে পারেনি, তেমনি ডা: সরওয়ারও একান্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানীর আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেননি। সমাজতান্ত্রিক ভাবনা বাংলাদেশের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার হতে আসা এই মেধাবী চিকিৎসককে ভিন্ন পথে টেনে নিয়ে যায়।
যে উদ্দেশ্যে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন- সেসময় যদি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করতেন, হয়তো আজ তিনি একজন মেজর জেনারেল বা ব্রিগেডিয়ার হতেন। জীবন হতো আরও উজ্জ্বল ও কীর্তিময়।
বুলগেরিয়া থেকে দেশে ফিরে চিকিৎসাশাস্ত্রে অভিজ্ঞ হলেও ইউরোপীয় জীবনধারা ও সমাজতান্ত্রিক অধ্যয়ন তাঁকে ছাড়েনি। পরিবারের চাপে দেশে আসলেও তিনি মনোনিবেশে চিকিৎসাসেবা দিতে পারেননি। সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা, পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের প্রত্যাশার চাপ—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে বিমর্ষ হয়ে পড়েন।
চেম্বার নিয়েও তাঁর পূর্ণ মনোযোগে রোগীসেবা সম্ভব হয়নি। তিনি ‘বুলগেরিয়ার ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, অসংখ্য রোগী সুস্থও করেছেন, কিন্তু জীবনযাপন করেছেন নিজের মতো। পরিবারের চেষ্টা সত্ত্বেও সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হননি।
তার আপন ছোটভাই ও অকৃত্রিম বন্ধু লে: কর্ণেল আবু মুসা মো: আইয়ুব কায়সারকে পিলখানা হত্যাকান্ডে হারানোর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি অন্যরকম হয়ে পড়েন। বেচে নেন নিঃস্ব, নির্ভাবনার ভিন্ন জীবনযাত্রা। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে এভাবেই কাটছে তাঁর জীবন।
বর্তমানে তিনি শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল ও অসুস্থ। তবু মানুষের মনে রয়ে গেছে ডা: সরওয়ার আলম—মেধা, সততা এবং সহানুভূতির প্রতীক। আসুন আমরা সবাই তাঁর জন্য দোয়া করি— যেন আল্লাহপাক তাঁকে শক্তি দেন, এবং তাঁর অমূল্য প্রতিভা ও চিকিৎসাসেবা চিরকাল মানুষের মনে স্মরণীয় হয়ে থাকে।
–সৈয়দ মামুনূর রশীদ। (totalmamungf@gmial.com)