USA news 24/7
Stay Ahead with the Latest in Business

প্রকৃত অপরাধী আড়ালে: অন্যায়ের দায় কেন শিপিং এজেন্টের ঘাড়ে!

চট্টগ্রাম বন্দরের বহুল আলোচিত ডিজিটাল জালিয়াতি ঘটনার প্রেক্ষাপটে আবারও সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—শিপিং এজেন্টদের কি অন্যায়ভাবে দায়ী করা হচ্ছে? দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে শিপিং এজেন্টদের ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তাদের “বলির পাঠা” বানানোর অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম হ্যাকিংয়ের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে গেলেও একটি শিপিং এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করায় বিষয়টি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে, যখন একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাস্টমসের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অবৈধভাবে প্রবেশ করে। আইপি স্পুফিং এবং মোবাইল ওটিপি জালিয়াতির মাধ্যমে তারা সিস্টেমে ঢুকে মদের একাধিক চালান খালাস করে নেয়। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে কাস্টমস কর্মকর্তা, সিএন্ডএফ এজেন্ট এবং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও সেখানে কোনো শিপিং এজেন্টের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে তদন্তের গতিপথ বদলে গিয়ে একটি শিপিং এজেন্টকে অভিযুক্ত করা হলে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দেয়—এটি কি তদন্তের স্বাভাবিক অগ্রগতি, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত?

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় শিপিং এজেন্টদের দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। তারা মূলত বিদেশি শিপিং লাইনের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে এবং জাহাজ আগমন, কনটেইনার খালাস ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তা করে। তবে কনটেইনারের ভেতরে কী পণ্য রয়েছে, তা যাচাই করার কোনো আইনগত বা কারিগরি ক্ষমতা শিপিং এজেন্টদের নেই। ‘Shipper’s Load, Count and Seal’ নীতির অধীনে পণ্য বোঝাই ও সিল করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে রপ্তানিকারকের ওপর। ফলে পণ্যের প্রকৃতি, পরিমাণ বা ঘোষণায় কোনো অসঙ্গতি থাকলে তার দায়ভারও স্বাভাবিকভাবেই আমদানিকারক বা রপ্তানিকারকের ওপর বর্তায়—শিপিং এজেন্টের ওপর নয়।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার। বিভিন্ন কনভেনশন ও বাণিজ্যিক নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিল অব লেডিংয়ে প্রদত্ত তথ্যের যথার্থতার দায় শিপারের। যদি সেখানে ভুল তথ্য দেওয়া হয়, তাহলে তার দায়ভার ক্যারিয়ার বা শিপিং এজেন্টের ওপর বর্তায় না। বরং ক্ষতিপূরণের দায় শিপারকেই বহন করতে হয়। দেশের প্রচলিত আইনেও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়, যেখানে পণ্যের ঘোষণা ও শুল্ক সংক্রান্ত দায় আমদানিকারকের ওপরই বর্তায়।

এই বাস্তবতার পরেও যদি কোনো শিপিং এজেন্টকে ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হয়, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, বরং পুরো খাতের জন্যই নেতিবাচক বার্তা বহন করে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক মহল থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, এ ধরনের ঘটনাগুলো বিদেশি শিপিং কোম্পানিগুলোর আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পুনর্বিবেচনা করতে পারে, যা সরাসরি দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে প্রভাব ফেলবে।

এছাড়া শিপিং খাতের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বন্দরভিত্তিক অর্থনীতি, লজিস্টিকস সেবা এবং সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, যদি প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত না করে সহজ লক্ষ্য হিসেবে শিপিং এজেন্টদের দায়ী করা হয়, তাহলে তা আইনের শাসনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেবে।

সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা জোর দিচ্ছেন একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর। প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি নির্দোষ শিপিং এজেন্টদের হয়রানি থেকে রক্ষা করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় এই খাতে অনিশ্চয়তা বাড়বে এবং দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পরিশেষে বলা যায়, শিপিং এজেন্টদের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না রেখে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা শুধু অন্যায়ই নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হতে পারে। তাই সময় এসেছে বাস্তবতা ও আইনের আলোকে বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের, যাতে করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থও সুরক্ষিত থাকে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.