EMail: corporatenews100@gmail.com
মিয়ানমারের সামরিক শাসক থেকে প্রেসিডেন্টে রূপান্তরিত হওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই ভারত সফরে যাচ্ছেন মিন অং হ্লাইং। ৩০ মে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের এই সফরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়; বরং এটি মিয়ানমারের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের বড় একটি প্রচেষ্টা।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সফর?
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে মিয়ানমার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট ASEAN-ও মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বকে বিভিন্ন শীর্ষ সম্মেলন থেকে কার্যত দূরে সরিয়ে রাখে।
ফলে গত পাঁচ বছরে কূটনৈতিকভাবে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল দেশটি।
কিন্তু ২০২৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হয়। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চাইছেন মিন অং হ্লাইং।
ভারতের কাছে কী চাইছে মিয়ানমার?
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের সামরিক সরকার ভারতের কাছ থেকে তিনটি বড় সুবিধা প্রত্যাশা করছে—
১. সীমান্ত নিরাপত্তায় সহযোগিতা
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। বিশেষ করে চিন ও রাখাইন অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
মিন অং হ্লাইং ভারতের সহযোগিতা চাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যাতে এসব বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান আরও কার্যকর করা যায়।
২. অর্থনৈতিক সহযোগিতা
মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। ভারতীয় বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব দেশটির অর্থনীতিকে কিছুটা হলেও চাঙ্গা করতে পারে।
৩. চীনের বিকল্প শক্তি হিসেবে ভারত
মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তবে অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে দেশটি।
ভারতের স্বার্থ কী?
প্রশ্ন উঠতে পারে—ভারত কেন এত আগ্রহী?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে মিয়ানমারের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদে।
বিরল খনিজের খোঁজে ভারত
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজ বা Rare Earth Elements-এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এসব খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মিয়ানমারে রয়েছে এসব খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত। ভারত এই সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আগ্রহী।
চীনের প্রভাব কমানো
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়।
মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে ভারত একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে চীনের একক প্রভাবকেও কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ করতে চায়।
নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হন মিন অং হ্লাইং। তবে আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন।
তবুও নির্বাচনের পর তিনি নিজেকে একজন বৈধ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। ভারত সফর সেই প্রচেষ্টারই অংশ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এরপর কি চীন সফর?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ভারতের পর খুব শিগগিরই চীন সফরে যেতে পারেন মিন অং হ্লাইং। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এটি হলে বোঝা যাবে, মিয়ানমার একই সঙ্গে ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার নীতি অনুসরণ করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ?
মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফর কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক ঘটনা নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারত চায় নিরাপদ সীমান্ত, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি করতে। অন্যদিকে মিয়ানমার চায় আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সমর্থন।
ফলে এই সফরের ফলাফল আগামী কয়েক মাসে ভারত-মিয়ানমার-চীন সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পাঁচ বছরের কূটনৈতিক একঘরে অবস্থা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফেরার চেষ্টা করছে মিয়ানমার। আর সেই যাত্রার প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে ভারতের দিকে হাত বাড়িয়েছেন প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। এই সফর শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন বার্তা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ব্যবসা, অর্থনীতি ও করপোরেট বিশ্বের সর্বশেষ বিশ্লেষণ পেতে চোখ রাখুন: করপোরেটনিউজ২৪ ডটকম।
সূত্র: দি স্ট্রেইট টাইমস