EMail: corporatenews100@gmail.com
ইরানের ওপর ফের মার্কিন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে শুরু হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। আর এই অনিশ্চয়তার ছায়া পড়েছে বাংলাদেশের ওপরও। যদিও দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৪ দিনের জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে, তবুও উদ্বেগ বাড়ছে সরকারের।
কেননা, তেল ও এলএনজির দাম বাড়লে বাড়বে আমদানি ব্যয়, বাড়বে ভর্তুকির চাপ। আর এতে সরকারের বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতিমধ্যেই লোকসানের বোঝা মাথায়
গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি বেশি দামে কিনতে হয়েছে। আর কম দামে বিক্রি করার কারণে সরকারের লোকসান হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা।
শুধু মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত তেল আমদানিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) লোকসান দিয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা। বাকি টাকা লোকসান হয়েছে এলএনজি আমদানিতে। এখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে এই বিড়ম্বনা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
জি-টু-জি চুক্তির মাধ্যমে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা
বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার আগেভাগেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল কেনার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে। টু সরকার (জি-টু-জি) প্রক্রিয়ায় ৪-৫টি কোম্পানি উন্মুক্ত দরপত্রের চেয়ে ৭০০ কোটি টাকা কম প্রিমিয়ামে তেল সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে।
গত ২০ জুন সিঙ্গাপুরে ১০টি সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা বৈঠকে ভারতের কোম্পানি আইওসিএল প্রথমবারের মতো ১০ ডলারের নিচে অর্থাৎ ৯.৫ ডলার প্রিমিয়ামে ডিজেল সরবরাহে রাজি হয়। পরে ইউনিপেক, পেট্রো চায়নাসহ আরও কয়েকটি কোম্পানি একই দরে তেল দিতে সম্মত হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে তেল পরিবহণে এখন অনেক খরচ। কিন্তু ভারতের কোম্পানি কম প্রিমিয়ামে রাজি হওয়ায় অন্য কোম্পানিগুলোও একই দামে রাজি হয়েছে। এক সেন্ট কম প্রিমিয়াম মানে দেশের ৮২ লাখ টাকা সাশ্রয়।’
তবে এই ১৬ লাখ টন তেল কিনতে সরকারকে ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সব কিছু নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর।
এলএনজি নিয়ে চিন্তা বাড়াচ্ছে
জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এলএনজি নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে। গত মার্চ থেকে কোনো কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ করছে না। পেট্রোবাংলা এখন স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
গত মার্চে স্পট মার্কেটে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিট এলএনজি কিনতে হয়েছিল ২৮ ডলারে। যুদ্ধবিরতির কারণে গত সপ্তাহে সেই দাম কমে ১৬-১৭ ডলারে নেমে এসেছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ফের দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘হরমুজ বন্ধ থাকলে তেল এবং এলএনজির দাম বাড়বে। এটা বাংলাদেশের জন্য চিন্তার বিষয়।’
তেলের বাজার এখন কেমন?
গত শুক্রবার শেষবার ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল বিক্রি হয়েছে ৭৬ ডলার ১০ সেন্ট দামে। মনে রাখা ভালো, মার্চ-এপ্রিলে যুদ্ধের সময় এই দাম ১১৪ ডলারের বেশি উঠেছিল।
আজ সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বেচাকেনা শুরু হবে। হরমুজ বন্ধের প্রভাব কেমন পড়ে, সেদিকে তাকিয়ে আছেন ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা।
মজুতের অবস্থা কত?
বিপিসির ট্যাংকিতে রোববার পর্যন্ত ৪ লাখ ১৪ হাজার টন ডিজেল মজুত ছিল, যা দিয়ে ৩৪ দিন চলবে। অকটেন আছে প্রায় ৪০ দিনের মতো। আমদানি সূচি অনুযায়ী এই মাসে আরও ৮-১০টি ডিজেলবাহী জাহাজ আসার কথা।
একটি স্বস্তির বিষয় হলো, যুদ্ধের সময় ৩০ হাজার টন ডিজেল কিনতে বিপিসিকে দিতে হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এখন সেই খরচ কমে ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।
ভর্তুকি নিয়ে টানাপোড়েন
বিপিসি গত চার মাসে জ্বালানি ভর্তুকি হিসেবে সরকারের কাছ থেকে এক টাকাও পায়নি। সংস্থাটি ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ প্রকল্প এবং অন্যান্য প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ টাকা তেল আমদানিতে খরচ করেছে। এতে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ২১ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
বিপিসি বারবার অর্থ বিভাগকে চিঠি দিয়েও এখনো কোনো সাড়া পায়নি বলে জানা গেছে।
সরকারের প্রস্তুতি কেমন?
গত মার্চে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেটি কাজে লাগিয়ে এবার আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। ডিপোগুলোকে ইতিমধ্যেই সতর্ক করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এইবার তেল নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা হবে না বলে আমরা মনে করছি।’
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু বিশ্ববাজারেই নয়, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার আগেভাগেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং ভর্তুকির চাপ দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছেই।
আগামী কয়েকদিনের দিকে নজর রাখতে হবে। তেল ও এলএনজির দামের ওঠানামা যেন বড় বিপর্যয় ডেকে না আনে, সেদিকে সতর্ক থাকছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত।