EMail: corporatenews100@gmail.com
চট্টগ্রামের শিপ ব্রেকিং শিল্পে কী ঘটছে?
ভাসমান লোহার খনি থেকে সংকটের কিনারায়:
বাংলাদেশের শিল্পখাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ শিপ ব্রেকিং শিল্প আজ গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। এক সময় যে শিল্পকে বলা হতো “ভাসমান লোহার খনি”, সেই খাত এখন জাহাজের সংকট, বাড়তি বিনিয়োগের চাপ, ঋণজট এবং নতুন করে চাঁদাবাজির কবলে পড়ে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল শিপ ব্রেকিং শিল্প
ষাটের দশকে আকস্মিকভাবেই সীতাকুণ্ড উপকূলে এই শিল্পের সূচনা। ১৯৬০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে এমভি সী আল ফাইন নামে একটি বড় জাহাজ ফৌজদারহাট উপকূলে আটকে পড়ে। সেটিকে আর সাগরে ফেরানো সম্ভব হয়নি। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জাহাজটি কিনে ভেঙে বিক্রি করেন।
সেখান থেকেই জন্ম নেয় বাংলাদেশের শিপ ব্রেকিং শিল্পের ভিত্তি।
সোনালি সময়: হাজার কোটি টাকার শিল্প
স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে জাহাজ আমদানি বাড়ে। বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের পর ব্যবসাটি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠে শতাধিক শিপইয়ার্ড।
এই শিল্পে—
- প্রায় ২ লাখ শ্রমিক সরাসরি কাজ করতেন।
- আরও প্রায় ৩ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
- সরকার পেত বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব।
- দেশের রড শিল্পের বড় অংশের কাঁচামাল আসত এখান থেকেই।
একটি জাহাজ মানেই যেন একটি ছোট দেশ
শুধু লোহা নয়, পুরনো জাহাজ থেকে পাওয়া যেত—
- তামা ও পিতল
- স্টেইনলেস স্টিল
- ফার্নিচার
- কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক্স
- টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি
- ক্রোকারিজ
- চিকিৎসা সরঞ্জাম
- অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা
- বৈদ্যুতিক তারসহ অসংখ্য পণ্য
এসব সামগ্রীর বিশাল বাজার গড়ে উঠেছিল সীতাকুণ্ড এলাকায়।
কেন সংকটে পড়ল শিল্পটি?
গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। অনেক ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হয়েছেন, কেউ ব্যবসা গুটিয়েছেন, কেউ দেশ ছেড়েছেন।
বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ
চাপ বাড়ছে
- গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা
- প্রতি ইয়ার্ডে ১০০–২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত বিনিয়োগ
- ব্যাংক ঋণের চাপ
- আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজের ঘাটতি
- কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি
নতুন আতঙ্ক: চাঁদাবাজি ও হামলার অভিযোগ
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ
সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ডের অন্তত সাতটি শিপইয়ার্ডে চাঁদাবাজি ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ইয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- বিওবি শিপ রিসাইক্লার্স
- বারাকা শিপব্রেকিং
- সাগরিকা শিপব্রেকিং
- জনতা শিপব্রেকিং
- ফোরস্টার
- মেহেরুন শিপব্রেকিং
- টি আর শিপব্রেকিং
অভিযোগ অনুযায়ী:
- রাস্তা বন্ধ করে চাঁদা দাবি
- মালামালবাহী গাড়ি আটকে দেওয়া
- কর্মকর্তাদের মারধর
- লুটপাট ও প্রাণনাশের হুমকি
- ইয়ার্ড দখলের চেষ্টা
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
“একশ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করে গ্রিন ইয়ার্ড করেছি। এখন সন্ত্রাসীদের কারণে গাড়িই ঢুকতে পারছে না।”
এমন অভিযোগ করেছেন একজন শিপ ব্রেকিং উদ্যোক্তা।
বিএসবিআরএর জরুরি সভা
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন।
২৩ জুন সীতাকুণ্ডে সংগঠনটির জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত হয়—
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক
- অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দাবি
- প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চাওয়া
- শিল্পাঞ্চলে নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ
পুলিশ কী বলছে?
সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ ধরনের কিছু অভিযোগ তারা পেয়েছে এবং ঘটনাস্থলে গিয়েছে। তবে অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে বলেও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের নির্মাণশিল্প, রড শিল্প ও পুনর্ব্যবহার অর্থনীতির জন্য শিপ ব্রেকিং খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরিবেশগত রূপান্তর, আর্থিক চাপ এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে এই শিল্প এখন কঠিন সময় পার করছে।
প্রশ্ন হচ্ছে— যথাযথ নীতি সহায়তা ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে, দেশের এই ঐতিহাসিক শিল্প কি আবার আগের জৌলুস ফিরে পাবে?