Corporate & Business News Bangladesh
Corporate Bangladesh Corporate Bangladesh Corporate News Bangladesh Company News CEO Interview Business Leadership

ভয়াবহ দূষণের শিকার কৃষিজমি

চান্দগাঁওয়ে শিল্পবর্জ্যে পরিবেশ দূষণ: আদালতের স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ

 

চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন মোহরার বাহির সিগন্যাল এলাকার বিস্তীর্ণ বিল ও কৃষিজমিতে শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য ফেলার অভিযোগে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও পদাধিকারবলে জাস্টিস অব দ্য পিস এ. জি. এম. মনিরুল হাসান সরকার। আগামী ১১ আগস্টের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কী অভিযোগ উঠেছে?

আদালতে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে, বাহির সিগন্যাল এলাকার হলিডে বিল, ব্রাহ্মণ বিল ও চৌধুরী বিল দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এসব বর্জ্য কৃঞ্চখালী হয়ে অনন্যা আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে কুয়াইশ ও বাথুয়া খাল পেরিয়ে খন্দকিয়ার পাশ দিয়ে হালদা নদীতে গিয়ে মিশছে। এতে পরিবেশ, কৃষিজমি, জলাশয় ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

কুয়াইশ–চান্দগাঁও কৃষক উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি অরুণ চন্দ্র বণিক গত ১৬ জুন আদালতে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগের সঙ্গে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নথিও সংযুক্ত করা হয়।

এসব নথি পর্যালোচনা করে আদালত মন্তব্য করেন, বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; বরং এটি পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর অভিযোগ।

যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বাহির সিগন্যাল এলাকায় অবস্থিত কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) পরিচালনা না করে রাসায়নিক তরল বর্জ্য উন্মুক্তভাবে নিষ্কাশন করছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • রীপ লেদার

  • মা জনাব পেপার মিল

  • ফোর এইচ গ্রুপ

  • রতন প্যাকেজ

  • একটি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা

  • ইত্তেহাব ফ্যাক্টরি

  • ইছা গোডেন

  • একটি সিগারেট কারখানাসহ আরও কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান

কৃষি, মৎস্য ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির অভিযোগ

আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, আগে কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য লোকালয়ে প্রবেশ ঠেকাতে একটি প্রতিরোধক বাঁধ ছিল। সেটি অপসারণ বা কেটে দেওয়ার পর শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি সিডিএর প্রধান ড্রেনেজ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে আশপাশের বিল, জলাশয় ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী—

  • ইরি ধানের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

  • মাছের খামারে মাছ মারা যাচ্ছে।

  • জলাশয়ের পানি দূষিত হচ্ছে।

  • তীব্র দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ।

  • জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে।

  • কৃষক ও মৎস্যচাষিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরকে ১২ দফা তদন্তের নির্দেশ

ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ২৫ ও ধারা ১৯০(১)(সি)-এর ক্ষমতাবলে আদালত পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালককে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাবে, তার মধ্যে রয়েছে—

  • গত তিন বছরে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না।

  • পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত মানা হয়েছে কি না।

  • ইটিপি সচল ছিল কি না।

  • শিল্পবর্জ্য কোথায় ফেলা হচ্ছে।

  • সরকারি ড্রেন বা জলাশয়ের সঙ্গে অবৈধ সংযোগ রয়েছে কি না।

  • কৃষিজমি ও মৎস্যসম্পদের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা।

  • বর্তমানে দূষণ অব্যাহত রয়েছে কি না।

  • জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির প্রকৃতি।

এছাড়া সরকার অনুমোদিত পরীক্ষাগারে রাসায়নিক নমুনা পরীক্ষা এবং পরিবেশগত ক্ষতির বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তদন্তে থাকবে পূর্ণ স্বাধীনতা

আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, তদন্তকারী কর্মকর্তারা আইন, প্রমাণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তদন্ত করবেন। আদালতের পর্যবেক্ষণকে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল বা ভবিষ্যৎ আইনগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

প্রয়োজনে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সহযোগিতা নিতে পারবে।

১১ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন

পরিবেশ অধিদপ্তরকে আগামী ১১ আগস্টের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। যৌক্তিক কারণে সময়ের প্রয়োজন হলে লিখিত আবেদন করে সময় বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছে।

আদালতের এই নির্দেশনার ফলে দীর্ঘদিনের শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি এবং সরকারি ড্রেনেজ ব্যবস্থার অপব্যবহারের বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.