EMail: corporatenews100@gmail.com
ডায়াবেটিস : চিনি মুক্ত খাবার বিক্রি নিশ্চিত করা হোক
জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস আজ: নিরাপদ খাবার নিশ্চিতে কতটা প্রস্তুত দেশ?
আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য— “নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করি, সুস্থ সবল জীবন গড়ি।” কিন্তু দিবসটি সামনে এলেই আবারও প্রশ্ন ওঠে—দেশের মানুষের খাবার কতটা নিরাপদ?
সাম্প্রতিক নানা গবেষণা ও প্রতিবেদনে খাবারে ঝুঁকির ইঙ্গিত মিলছে নিয়মিতই। মুরগির মাংসে ভারী ধাতু, খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক, সয়াবিন তেল ও ডিমে ক্ষতিকর উপাদান—এমন তথ্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এসব শুধু জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি নয়; চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস ও সামাজিক ক্ষতির বোঝাও বাড়াচ্ছে।
নিরাপদ খাদ্যের দায়িত্বে কে?
দেশে খাদ্য নিরাপত্তা তদারকির জন্য ২০১৫ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। সংস্থাটির দায়িত্ব—খাদ্য উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত পুরো চেইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মান নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি, গবেষণা ও সমন্বয় করা।
তবে এক দশকের বেশি সময় পেরোলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি সংস্থাটি—এমন অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
কাঠামো আছে, সক্ষমতা কম
বিএফএসএর জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যালয় থাকলেও জনবল ঘাটতি বড় সমস্যা। অনুমোদিত পদ ৩৭১টি হলেও কিছু পদ এখনও শূন্য। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা—দক্ষ জনবলের অভাব ও নিজস্ব পরীক্ষাগারের অনুপস্থিতি।
ভেজালবিরোধী অভিযান চালানোর বিধান থাকলেও কেন্দ্রীয়ভাবে মাত্র কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট থাকায় দেশজুড়ে নিয়মিত অভিযান সম্ভব হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তদারকি সীমিত পর্যায়েই আটকে থাকে।
কী কী কাজ করছে বিএফএসএ?
আইন অনুযায়ী সংস্থাটির কাজের পরিধি বিস্তৃত:
- খাদ্য আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন
- বাজার, রেস্তোরাঁ ও কারখানা পরিদর্শন
- খাদ্য নমুনা পরীক্ষা
- প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম
- ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও গবেষণা
- মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ
নিয়ম লঙ্ঘন করলে সতর্কতা, প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক তথ্য অনুযায়ী (২০২২–২৩ অর্থবছর):
- ১০৭০টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা
- ১৬৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালত
- ১ কোটি টাকার বেশি জরিমানা
- ১১ হাজারের বেশি খাদ্য স্থাপনা পরিদর্শন
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের খাদ্যবাজারের আকারের তুলনায় এ সংখ্যা খুবই কম।
কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
বিএফএসএর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সংস্থাটি তুলনামূলক নতুন এবং দক্ষ জনবল তৈরি করতে সময় লাগছে। দেশে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে শিক্ষা ও বিশেষজ্ঞও সীমিত। ফলে কাজ করতে করতেই দক্ষতা বাড়াতে হচ্ছে।
সামনে কী জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল দিবস পালন নয়—বাস্তব অগ্রগতি দরকার। যেমন:
- আধুনিক ল্যাব স্থাপন
- দক্ষ ফুড সেফটি বিশেষজ্ঞ তৈরি
- নিয়মিত বাজার নজরদারি
- কঠোর আইন প্রয়োগ
- ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি
জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে যেন বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা হয়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। কারণ নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
ফুটপাতের চা–নাশতায় অতিরিক্ত চিনি: ডায়াবেটিস ঝুঁকিতে নগরজীবন, করণীয় কী?
শহর থেকে মফস্বল—বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় সকাল শুরু হয় ফুটপাতের চায়ের দোকান ঘিরে। অফিসগামী মানুষ, শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী—সবারই ভরসা এই সুলভ চা–নাশতা। কিন্তু এই সহজলভ্য খাবারের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি: অতিরিক্ত চিনি। ফুটপাতের বেশিরভাগ চা, লাচ্ছি, শরবত, বিস্কুটভিত্তিক নাশতা এমনকি অনেক রান্না করা খাবারেও বাড়তি চিনি মেশানো হয় স্বাদ বাড়ানোর জন্য। এতে ডায়াবেটিসসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
চিনি যেন ‘ডিফল্ট’ উপাদান
ফুটপাতের চায়ের দোকানে চিনি ছাড়া চা চাওয়া অনেক সময় ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে দেখা হয়। অধিকাংশ দোকানে আগে থেকেই চা–লিকার বা দুধে চিনি মেশানো থাকে। ফলে ক্রেতা চাইলেও চিনি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। একই চিত্র শরবত, দুধচা, মালাই চা, লাচ্ছি বা রঙিন পানীয়ের ক্ষেত্রেও। বিক্রেতাদের যুক্তি—চিনি কম হলে ক্রেতারা স্বাদ পছন্দ করেন না, বিক্রিও কমে যায়।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক চিনি গ্রহণের একটি সীমা আছে। কিন্তু দিনের শুরুতে এক–দুই কাপ বেশি চিনি দেওয়া চা, সঙ্গে মিষ্টি নাশতা—এভাবেই অজান্তে সীমা ছাড়িয়ে যায় অনেকের গ্রহণমাত্রা। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ওজন বৃদ্ধি, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। শহুরে জীবনে যারা নিয়মিত বাইরে চা–নাশতা খান, তাদের জন্য চিনি নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক রোগী অভিযোগ করেন, চিনি ছাড়া চা চাইলে দোকানিরা বিরক্ত হন বা আলাদা করে বানাতে চান না। আবার কোথাও ‘চিনি ছাড়া’ বলা হলেও দুধ বা লিকারে আগে থেকেই চিনি মেশানো থাকে।
চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এ অবস্থা কেবল অসুবিধাই নয়, সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকি। কারণ রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেলে তাৎক্ষণিক জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
কেন বাড়তি চিনি ব্যবহার?
ফুটপাতের বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বললে কয়েকটি কারণ সামনে আসে:
- স্বাদ ও ক্রেতা চাহিদা – মিষ্টি স্বাদ বেশি জনপ্রিয়।
- কম মানের উপকরণ ঢাকতে – কখনো নিম্নমানের চা–পাতা বা দুধের স্বাদ ঢাকতে বেশি চিনি দেওয়া হয়।
- অভ্যাসগত ব্যবহার – অনেক বিক্রেতা নির্দিষ্ট মাপ ছাড়াই ‘চোখমুখে’ চিনি দেন।
- সচেতনতার অভাব – অতিরিক্ত চিনির স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন।
সরকারের কী ভূমিকা থাকতে পারে?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি ব্যক্তিগত পছন্দের বাইরে এখন জনস্বাস্থ্যের ইস্যু। তাই নীতিগত পদক্ষেপ দরকার।
১) নীতিমালা ও গাইডলাইন
খোলা খাবার ও পানীয় বিক্রিতে চিনির ব্যবহার নিয়ে নির্দেশিকা তৈরি করা যেতে পারে। যেমন—প্রি–মিক্সে চিনি না মেশানো, আলাদা চিনি দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা।
২) প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা
ফুটপাতের খাদ্য বিক্রেতাদের জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এতে স্বাস্থ্যবিধি, পুষ্টি ও চিনি ব্যবহারের সীমা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া সম্ভব।
৩) লাইসেন্সিং ব্যবস্থার উন্নয়ন
সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসন লাইসেন্স দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্ত জুড়ে দিতে পারে। নিয়মিত নবায়নের সময় তদারকি করা যেতে পারে।
৪) জনসচেতনতা প্রচার
গণমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে কম চিনি খাওয়ার অভ্যাসে উৎসাহিত করা দরকার। ক্রেতা সচেতন হলে বিক্রেতারাও বদলাতে বাধ্য হবেন।
৫) স্কুল–কলেজ এলাকায় বিশেষ নজরদারি
তরুণদের মধ্যে মিষ্টি পানীয়ের প্রবণতা বেশি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে বিক্রি হওয়া পানীয় ও নাশতায় চিনি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের করণীয়
খোলা খাবার সরাসরি নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো নিয়মিত মনিটরিং, নমুনা পরীক্ষা এবং গাইডলাইন বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ‘লো–সুগার অপশন’ রাখার সংস্কৃতি গড়ে তোলা গেলে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সমাধান কি সম্ভব?
অনেক দেশেই এখন “লেস সুগার” বা “নো সুগার অ্যাডেড” সংস্কৃতি জনপ্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এই চাহিদা তৈরি হচ্ছে। কিছু আধুনিক চায়ের দোকানে ইতোমধ্যে চিনি আলাদা দেওয়া শুরু হয়েছে। এটি ফুটপাতের দোকানেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, পুরো সমস্যার সমাধান রাতারাতি হবে না। তবে ছোট পরিবর্তন বড় প্রভাব ফেলতে পারে—যেমন:
- আগে থেকে চিনি না মেশানো
- মাপা চামচে চিনি ব্যবহার
- ক্রেতাকে বিকল্প দেওয়া
- কম মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা
ফুটপাতের চা–নাশতা বাংলাদেশের সংস্কৃতির অংশ। এটিকে বন্ধ করা নয়, বরং স্বাস্থ্যসম্মত করা জরুরি। অতিরিক্ত চিনি একটি নীরব ঝুঁকি—যা ধীরে ধীরে বড় অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেয়। সরকার, সিটি করপোরেশন, খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিক্রেতা এবং ভোক্তা—সবাই মিলেই পরিবর্তন আনতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনই সেই উদ্যোগ নেব, নাকি স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ার পর?
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সব জায়গায় চিনি মুক্ত খাবার বিক্রি নিশ্চিত করা হোক।
করপোরেট নিউজ ২৪/ জিএনএস