EMail: corporatenews100@gmail.com
বাংলাদেশে কেন জমছে না হালাল পণ্যের বাজার?
বাংলাদেশের হালাল বাজার আটকে আছে মূলত তিনটি জায়গায়
ডেস্ক রিপোর্ট | অর্থনীতি ও ব্যবসা
বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্যের বাজার যখন ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছাচ্ছে, তখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে হালাল পণ্যের বাজার এখনো শক্ত ভিত গড়তে পারছে না। একাধিক উদ্যোগ, সার্টিফিকেশন ও করপোরেট বিনিয়োগের পরও স্থানীয় বাজারে হালাল ধারণা রয়ে গেছে সীমিত প্রভাবের মধ্যে।
২০১৭ সালে বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার বাংলাদেশ ‘সানসিল্ক হিজাব রিফ্রেশ’ নামে হিজাব ব্যবহারকারী নারীদের জন্য বিশেষ শ্যাম্পু বাজারে আনে। দীর্ঘ সময় আবৃত মাথার চুলের যত্নকে সামনে রেখে আনা এ পণ্য নিয়ে শুরুতে আলোচনা হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ইউনিলিভারের শ্যাম্পু বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
এ ধরনের উদাহরণ একাধিক। ‘অ্যারোমেটিক হালাল সাবান’ নামের একটি পণ্যও হালাল শব্দ ও উপস্থাপনার পরও দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তার আস্থা ধরে রাখতে পারেনি। বিপণন বিশ্লেষকদের মতে, শুধু হালাল ট্যাগ থাকলেই ভোক্তা দীর্ঘদিন একটি ব্র্যান্ডে আটকে থাকেন না। গুণমান, দাম, সহজলভ্যতা ও ব্যবহারিক অভ্যাসই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে।
খাদ্যপণ্যের বাইরে হালাল ধারণা দুর্বল
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হালাল সনদ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশই খাদ্যপণ্যভিত্তিক। চা, নুডলস, সিরিয়াল, মাংস, বিস্কিট, চানাচুর, হিমায়িত খাদ্য—এসব পণ্যে হালাল সনদের ব্যবহার দেখা গেলেও প্রসাধনী, পোশাক, সেবা কিংবা শিল্পপণ্যে হালাল ধারণার বিস্তার এখনো সীমিত।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য, বাংলাদেশে ভোক্তারা সাধারণভাবে মনে করেন—“দেশের পণ্য মানেই হালাল।” ফলে আলাদা করে হালাল সনদের প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করেন না। এই মানসিকতার কারণে স্থানীয় বাজারে হালাল পণ্যের আলাদা চাহিদা তৈরি হয়নি।
সচেতনতা আছে, আচরণে প্রতিফলন নেই
গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম এবং হালাল পণ্যের ধারণার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বাড়ছে। তবে এই মনোভাব বাস্তব ভোক্তা আচরণে এখনো ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা বাড়লেও তা নিয়মিত ক্রয়াভ্যাসে রূপ নিচ্ছে না।
বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের বাইরে হালাল পোশাক, প্রসাধনী ও লাইফস্টাইল পণ্যে ক্রেতারা হালাল বিষয়টিকে এখনো অগ্রাধিকার তালিকায় রাখছেন না।
রফতানিতে সম্ভাবনা, বাস্তবে সীমাবদ্ধতা
আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল খাদ্যপণ্যের আকার ইতোমধ্যে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং আগামী এক দশকে তা তিন গুণের বেশি বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। বাংলাদেশ থেকেও কিছু প্রতিষ্ঠান হালাল সনদ নিয়ে বিদেশে পণ্য রফতানি করছে, তবে তা মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি ও মুসলিম ক্রেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত হালাল সার্টিফিকেশন কাঠামোর দুর্বলতা, নীতিগত সমন্বয়ের অভাব এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রচারণার ঘাটতি বাংলাদেশের বড় বাজার ধরার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“হালাল” কি শুধু মার্কেটিং ট্যাগ?
অর্থনীতিবিদ ও বিপণন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের হালাল বাজার আটকে আছে মূলত তিনটি জায়গায়—
- হালাল ধারণার স্পষ্ট সংজ্ঞার অভাব
- সার্টিফিকেশনের বিশ্বাসযোগ্য ব্র্যান্ড ভ্যালু না তৈরি হওয়া
- পণ্য পার্থক্যকরণ ও ইউনিক সেলিং প্রপোজিশনের ঘাটতি
অনেক ভোক্তার কাছেই হালাল শব্দটি এখনো একটি ‘মার্কেটিং কৌশল’ হিসেবেই বিবেচিত হয়, আলাদা মান বা অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন হিসেবে নয়।
সামনে পথ কোনটা?
বিশ্লেষকদের মতে, হালাল পণ্যের বাজার শক্ত করতে হলে কেবল ধর্মীয় অনুভূতির ওপর নির্ভর না করে গুণমান, নিরাপত্তা, ট্রেসেবিলিটি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে সামনে আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় নীতি সহায়তা, একক স্বীকৃত সার্টিফিকেশন কাঠামো এবং শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং।
না হলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হয়েও বাংলাদেশ হালাল অর্থনীতির বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কেবল দর্শক হয়েই থেকে যাবে।
করপোরেট নিউজ ২৪/ এসি