EMail: corporatenews100@gmail.com
তেল সংকটে লাইটারেজ জাহাজের চলাচল কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে মাদার ভ্যাসেল সমূহের পণ্য খালাসে ধীর গতি চলছে। ফলে আমদানীকারক ও জাহাজের এজেন্টদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জাহাজের খরচ ও শ্রমিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয় বাড়বে। পাশাপাশি বিদেশি জাহাজগুলো স্থানীয়ভাবে বাঙ্কার সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হতে থাকলে বিশ্বে বন্দরের সুনাম নষ্ট হবে।
বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক তেল সংকট নতুন করে এই বন্দরের কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বহির্নোঙরে অবস্থান করা মাদার ভেসেলগুলোর ওপর।
তেল সংকট কীভাবে সমস্যাকে বাড়াচ্ছে
লাইটারেজ জাহাজগুলো মূলত বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছে দেয়। কিন্তু জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে এসব জাহাজের চলাচল কমে গেছে।
ফলে:
-
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস সম্ভব হচ্ছে না
-
বহির্নোঙরে মাদার ভেসেলের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে
-
পুরো লজিস্টিক চেইন ধীরগতির হয়ে পড়ছে
আমদানিকারক ও এজেন্টদের উদ্বেগ
পণ্য খালাসে বিলম্ব মানেই বাড়তি খরচ। জাহাজ যত বেশি সময় বন্দরের বাইরে অপেক্ষা করবে, তত বেশি:
-
ডেমারেজ চার্জ (অতিরিক্ত অবস্থান খরচ)
-
শ্রমিক ব্যয়
-
অপারেশনাল খরচ
এতে শেষ পর্যন্ত আমদানিকারকদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব বাজারেও পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ঝুঁকি
বিদেশি জাহাজগুলো সাধারণত স্থানীয়ভাবে জ্বালানি (বাঙ্কার) সংগ্রহের ওপর নির্ভর করে।
কিন্তু যদি তারা নিয়মিতভাবে এই সুবিধা না পায়, তাহলে:
-
বন্দরের প্রতি আস্থা কমে যাবে
-
ভবিষ্যতে জাহাজগুলো বিকল্প বন্দর বেছে নিতে পারে
-
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে
সামগ্রিক প্রভাব
এই পরিস্থিতি শুধু একটি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ছে:
-
শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহে
-
নৌপথে পণ্য পরিবহনে
-
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে
কী করা যেতে পারে
সমস্যা সমাধানে কিছু বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি:
-
লাইটারেজ জাহাজের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা
-
পণ্য খালাস ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সমন্বয় বৃদ্ধি
-
বিকল্প পরিবহন ও অস্থায়ী স্টোরেজ ব্যবস্থা তৈরি
-
বাঙ্কারিং সুবিধা শক্তিশালী করা
বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে ধীর গতি এখন শুধু একটি অপারেশনাল সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিচ্ছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়াত হামিম বলেন, ‘জ্বালানি খালাস ও সরবরাহ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বন্দরে জ্বালানি সরবরাহে গতি আনতে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ছে আরও ১টি জ্বালানিবাহী জাহাজ। বর্তমানে খালাস চলমান থাকা ‘চ্যাং হ্যাং হং তু’ ও ‘এলপিজি সেভান’- এর মধ্যে প্রথমটি বুধবার ভিড়েছে এবং দ্বিতীয়টি শুক্রবার (২০ মার্চ) বন্দরে ভিড়বে, যা জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে সহায়ক হবে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তালিকা অনুযায়ী, চ্যাং হ্যাং হং তু’ নামের জাহাজটি মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস অয়েল নিয়ে ১৫ মার্চ বন্দরে এসেছে এবং বর্তমানে ব্রাভো মুরিং-এ অবস্থান করছে। জাহাজটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন কার্গো খালাস করেছে এবং এর সম্পূর্ণ খালাস শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ১৯ মার্চ ২০২৬।
অন্যদিকে, ‘এলপিজি সেভেন’ জাহাজটি ওমান থেকে এলপিজি নিয়ে ৮ মার্চ আগমন করে কুতুবদিয়া এলাকায় অবস্থান করছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০২০ মেট্রিক টন এলপিজি খালাস হয়েছে এবং জাহাজটির সম্পূর্ণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০ মার্চ ২০২৬। জাহাজটি শুক্রবার বন্দরে ভিড়বে বলে জানা গেছে।
তালিকায় আরও দেখা যায়, মোট ২৮টি জ্বালানিবাহী জাহাজের মধ্যে অধিকাংশই ইতোমধ্যে কার্গো খালাস সম্পন্ন করে বন্দর ত্যাগ করেছে। এর মধ্যে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ওমান ও ভারতের বিভিন্ন বন্দর থেকে আসা জাহাজগুলো এলএনজি, এলপিজি, ক্রুড অয়েল, গ্যাস অয়েল, এইচএসএফও ও বেস অয়েল সরবরাহ করেছে।
এছাড়া কয়েকটি জাহাজ বর্তমানে ‘প্যাসেজ’-এ রয়েছে, অর্থাৎ তারা বন্দরের পথে রয়েছে। এর মধ্যে কাতার, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, অ্যাঙ্গোলা, থাইল্যান্ড ও ওমান থেকে আসা জাহাজ রয়েছে, যেগুলো এলএনজি, এইচএসএফও, এলপিজি ও বেস অয়েল বহন করছে।
কনি/জিএনএস