EMail: corporatenews100@gmail.com
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেলেও বাংলাদেশের বাজারে উল্টো আবারও বেড়েছে সোনার দাম। একদিকে বিশ্ববাজারে যুদ্ধ, তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা; অন্যদিকে দেশের বাজারে স্থানীয় চাহিদা ও কাঁচা স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন রেকর্ড গড়েছে স্বর্ণের দাম। ফলে বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।
১১ মে ২০২৬ সালের বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে স্বর্ণবাজারে। একই সময়ে বাংলাদেশের বাজারে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পৌঁছে গেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। কেন এমন হচ্ছে, সামনে দাম আরও বাড়বে নাকি কমবে—এসব প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
বিশ্ববাজারে কেন কমল স্বর্ণের দাম?
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬৫৭ ডলারে নেমে আসে। একই সঙ্গে মার্কিন গোল্ড ফিউচারও কমেছে। সাধারণত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়লে স্বর্ণের দাম বাড়ে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।
মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও তেলের মূল্যবৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট Donald Trump ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এই পথ দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি পরিবহন হয়। ফলে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। আর তেলের দাম বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মূল্যস্ফীতি বাড়লে স্বর্ণের দাম কমে কেন?
সাধারণভাবে স্বর্ণকে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে নিরাপদ বিনিয়োগ ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার দীর্ঘ সময় উঁচু রাখে। এতে মানুষ ব্যাংক আমানত বা বন্ডে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হয়, কারণ সেখান থেকে সুদ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে স্বর্ণ কোনো সুদ দেয় না। ফলে উচ্চ সুদের পরিবেশে স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কিছুটা কমে যায়। বর্তমানে সেই চাপই দেখা যাচ্ছে বাজারে।
বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংক Goldman Sachs ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমানোর পূর্বাভাস পিছিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে ধারণা করা হচ্ছিল ২০২৬ সালেই সুদের হার কমবে, এখন তারা বলছে হার কমতে পারে ২০২৬ সালের শেষভাগ বা ২০২৭ সালে গিয়ে।
এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন বার্তা গেছে—অর্থাৎ উচ্চ সুদের যুগ আরও দীর্ঘ হতে পারে। আর এই প্রত্যাশাই আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
ফেডারেল রিজার্ভের সতর্কবার্তা
মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক Federal Reserve সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ এবং জ্বালানি সরবরাহ সংকট এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে তেলের দাম বেড়ে গেলে পরিবহন, উৎপাদন এবং শিল্পখাতে ব্যয় বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিশ্বব্যাপী পণ্যমূল্যে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এখন অপেক্ষা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনের জন্য। কারণ সেই তথ্য থেকেই বোঝা যাবে ফেড আগামীতে কী ধরনের মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে পারে।
চীনের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব
বিশ্বের অন্যতম বড় স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশ China। দেশটির চায়না গোল্ড অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের স্বর্ণ উৎপাদন কমেছে।
নিরাপত্তা পরিদর্শনের কারণে কয়েকটি গলন কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে এর প্রভাব খুব বেশি দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উৎপাদন কমে গেলে ভবিষ্যতে আবারও স্বর্ণের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বাজারে কেন উল্টো বাড়ছে দাম?
বিশ্ববাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে উল্টো বেড়েছে স্বর্ণের মূল্য। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা Bangladesh Jewellers Association নতুন করে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়িয়েছে।
এখন দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকায়। এছাড়া—
২১ ক্যারেট: ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭২ টাকা
১৮ ক্যারেট: ২ লাখ ১৩ টাকা
সনাতন পদ্ধতি: ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩ টাকা
বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম বাড়ার কারণেই এই সমন্বয় করা হয়েছে।
বাংলাদেশের বাজারে আন্তর্জাতিক দামের পাশাপাশি ডলার রেট, আমদানি ব্যয়, স্থানীয় চাহিদা এবং কর কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বিশ্ববাজারে সাময়িক পতন হলেও দেশীয় বাজারে অনেক সময় দাম কমে না।
কেন এত ঘন ঘন বদলাচ্ছে স্বর্ণের দাম?
চলতি বছরেই বাংলাদেশের বাজারে ৬৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ বার দাম বেড়েছে এবং ২৮ বার কমেছে।
এটি দেখায় যে বাজার এখন অত্যন্ত অস্থির অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের বিনিময় হার এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতা প্রতিদিনই পরিবর্তিত হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে স্বর্ণের দামে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে বছরে কয়েকবার দাম পরিবর্তন হলেও এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন দর ঘোষণা করতে হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য কী বার্তা?
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণবাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল। স্বল্পমেয়াদে বড় ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, আগামী কিছু সময় স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ ডলারের মধ্যেই ওঠানামা করতে পারে।
বাংলাদেশের বাজারেও একই ধরনের অস্থিরতা দেখা যেতে পারে। কারণ বিশ্ববাজারে সামান্য পরিবর্তন হলেও তার প্রভাব স্থানীয় বাজারে দ্রুত পড়ে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণ এখনো নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলে মানুষ আবারও স্বর্ণে ঝুঁকতে পারে।
অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও পতন
শুধু স্বর্ণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে।
রুপার দাম কমেছে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ
প্লাটিনাম কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ
প্যালাডিয়াম কমেছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ
এতে বোঝা যাচ্ছে বিনিয়োগকারীরা আপাতত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ কমাচ্ছেন।
সামনে কী হতে পারে?
বিশ্ববাজারে এখন সবচেয়ে বড় প্রভাবক তিনটি বিষয়—
১. মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি
২. তেলের মূল্যবৃদ্ধি
৩. যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নীতি
এই তিনটি বিষয়ের যেকোনো পরিবর্তন স্বর্ণের বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
যদি যুদ্ধ আরও তীব্র হয় এবং তেলের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এতে স্বল্পমেয়াদে স্বর্ণের ওপর চাপ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে আবারও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে।
অন্যদিকে যদি যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দেয়, তাহলে স্বর্ণের বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালের স্বর্ণবাজার এখন এক অনিশ্চয়তার মোড়ে দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে পতন হলেও বাংলাদেশের বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখাচ্ছে যে স্থানীয় বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা। তাই যারা এখন স্বর্ণ কিনবেন বা বিনিয়োগ করবেন, তাদের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও স্থানীয় বাজার—দুই দিকই সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে।
কনি/ এইচএইচ