Corporate & Business News Bangladesh
Corporate Bangladesh Corporate Bangladesh Corporate News Bangladesh Company News CEO Interview Business Leadership

বৈশ্বিক গাড়ি শিল্পে উদ্ভাবনের নতুন কেন্দ্র এখন চীন

সাংহাই: একসময় বিশ্বের গাড়ি নির্মাতাদের জন্য কম খরচে উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল চীন। কিন্তু সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন শুধু উৎপাদন নয়, বৈদ্যুতিক যান (EV), ব্যাটারি, সফটওয়্যার এবং স্মার্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও চীন হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

এই পরিবর্তনের স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেছে চলতি বছরের মে মাসে। মার্কিন গাড়ি নির্মাতা জেনারেল মোটরস (GM) তাদের নতুন Buick Electra E7 মডেলের ১০ হাজারের বেশি ইউনিট প্রথম মাসেই চীনে বিক্রি করেছে। মডেলটির নাম আমেরিকান হলেও এর নকশা, প্রকৌশল, প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন—সবকিছুই হয়েছে চীনে।

চীনের প্রকৌশলীদের হাতেই নতুন গাড়ির উন্নয়ন

Buick Electra E7 তৈরি করেছে জিএম এবং তাদের চীনা অংশীদার SAIC Motor-এর যৌথ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Pan Asia Technical Automotive Centre (PATAC)

সাংহাইভিত্তিক এই গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার প্রকৌশলী কাজ করছেন। তারাই সম্পূর্ণভাবে গাড়িটির প্রযুক্তিগত নকশা, সফটওয়্যার, প্ল্যাটফর্ম এবং উন্নয়ন পরিচালনা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি জিএমের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আগে নতুন মডেলের সব সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সদর দপ্তর থেকে নেওয়া হলেও এখন চীনের প্রকৌশলীরা অনেক বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছেন।

চীনের প্রযুক্তি যাবে বিশ্ববাজারে

জিএম শুধু চীনের বাজারেই এই প্রযুক্তি সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটি Buick Electra E7 দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানির পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের Cadillac Optiq মডেলেও চীনে তৈরি নতুন প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ, আগে যেখানে চীনে তৈরি প্রযুক্তি শুধু স্থানীয় বাজারের জন্য ব্যবহৃত হতো, এখন সেটিই বৈশ্বিক বাজারের গাড়িতে যুক্ত হচ্ছে।

Xiao Yao প্ল্যাটফর্ম কী?

নতুন Electra E7-এর মূল শক্তি হলো Xiao Yao নামে একটি আধুনিক গাড়ির প্ল্যাটফর্ম।

‘Xiao Yao’ নামটি এসেছে চীনের দাওবাদ (Taoism) দর্শন থেকে, যার অর্থ ‘সব ধরনের বাধা থেকে মুক্তি’।

এই প্ল্যাটফর্মের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—

  • ৯০০ ভোল্ট সুপার-ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তি
  • উন্নত প্লাগ-ইন হাইব্রিড পাওয়ারট্রেন
  • অত্যন্ত কম জ্বালানি খরচ
  • উন্নত সফটওয়্যারভিত্তিক গাড়ি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
  • আধুনিক বৈদ্যুতিক ড্রাইভ সিস্টেম

এসব প্রযুক্তির অনেকগুলোই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি জিএমের গাড়িতে নেই।

Cadillac-এও আসছে চীনের প্রযুক্তি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের Cadillac Optiq মডেলে বর্তমানে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি Ultium Platform-এর পরিবর্তে চীনে তৈরি Xiao Yao Platform ব্যবহার করা হতে পারে।

এটি বাস্তবায়িত হলে সেটি হবে জিএমের বৈশ্বিক কৌশলে একটি বড় পরিবর্তন।

কেন চীনের দিকে ঝুঁকছে বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতারা?

শুধু জিএম নয়, বিশ্বের আরও অনেক বড় গাড়ি নির্মাতা এখন চীনের গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • Volkswagen
  • Renault
  • Nissan
  • Honda
  • Toyota-এর কিছু প্রকল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে—
  • বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তিতে চীনের দ্রুত অগ্রগতি
  • উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি
  • কম উন্নয়ন ব্যয়
  • দ্রুত নতুন মডেল বাজারে আনার সক্ষমতা
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও সফটওয়্যার উন্নয়নে এগিয়ে থাকা

সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কমছে

চীনে জিএমের সাবেক প্রকৌশলী এবং বর্তমানে স্বাধীন অটো বিশ্লেষক ঝু ইউলং বলেন, “Electra মডেলের ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো গাড়ির নকশা ও প্রযুক্তিগত রোডম্যাপ পুরোপুরি চীনের প্রকৌশলীদের হাতে ছিল।” তার মতে, আগে সব বড় সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে নেওয়া হলেও এখন স্থানীয় প্রকৌশলীরা অনেক বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন।

Ultium বনাম Xiao Yao

জিএমের যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি Ultium Platform-এর ওপর নির্মিত বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোর বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে।

অন্যদিকে, Xiao Yao Platform-ভিত্তিক Buick Electra E7 চীনের বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

এটি প্রমাণ করছে, স্থানীয় বাজারের চাহিদা বুঝে তৈরি প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মডেলের তুলনায় বেশি সফল হতে পারে।

বৈশ্বিক অটো শিল্পে নতুন বাস্তবতা

গত এক দশকে চীন শুধু বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ির বাজারই নয়, বরং বৈদ্যুতিক যানবাহন, ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং স্মার্ট সফটওয়্যার উন্নয়নের অন্যতম শীর্ষ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিশ্বের বড় বড় গাড়ি নির্মাতারা এখন আর শুধু চীনে কারখানা স্থাপন করছে না; তারা গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যতের গাড়ি উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও চীনের প্রকৌশলীদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

চীনের অটোমোবাইল শিল্প এখন একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। একসময়ের ‘বিশ্বের কারখানা’ আজ বৈশ্বিক উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। জেনারেল মোটরস, ভক্সওয়াগেন এবং রেনল্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নের দায়িত্ব চীনের গবেষণা দলকে দিচ্ছে, তখন স্পষ্ট হচ্ছে যে ভবিষ্যতের বৈদ্যুতিক ও স্মার্ট গাড়ির প্রযুক্তি নির্ধারণে চীনের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে। আগামী বছরগুলোতে বিশ্ব অটোমোবাইল শিল্পে এই প্রবণতা আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

করপোরেটনিউজ২৪/ রয়টার্স, এসটি

Leave A Reply

Your email address will not be published.