EMail: corporatenews100@gmail.com
দেশের সীমিত আর্থিক সম্পদের কার্যকর ব্যবহার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ব্যয় সংকোচনের একগুচ্ছ নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ জারি করা নতুন নির্দেশনায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের ব্যয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, আপাতত সরকারি অর্থে নতুন যানবাহন কেনা, বিদেশ ভ্রমণ, নতুন ভবন নির্মাণ এবং কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ সুবিধা স্থগিত থাকবে।
সব ধরনের যানবাহন কেনায় সাময়িক নিষেধাজ্ঞা
নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেট থেকে নতুন করে কোনো মোটরযান, জলযান কিংবা আকাশযান কেনা যাবে না। তবে সরকারি কাজে ব্যবহৃত ১০ বছরের বেশি পুরোনো যানবাহন প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হলে নির্ধারিত শর্তে নতুন যান কেনার সুযোগ থাকবে।
এছাড়া নতুন প্রতিষ্ঠিত সরকারি সংস্থা প্রয়োজনীয় যৌক্তিকতা দেখিয়ে অর্থ বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে যানবাহন সংগ্রহ করতে পারবে।
ইলেকট্রিক গাড়ির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব
সরকার পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহ দিতে নতুন একটি শর্তও যুক্ত করেছে। অ্যাম্বুলেন্স এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ কাজে ব্যবহৃত যানবাহন ছাড়া ভবিষ্যতে প্রতিস্থাপন বা নতুনভাবে কেনা সরকারি জিপ ও কার অবশ্যই ফুল ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (FEV) হতে হবে।
এর মাধ্যমে জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণও কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ বন্ধ
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা সুদমুক্ত বিশেষ ঋণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার সুবিধাও আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদেশ সফরেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ
সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ আপাতত বন্ধ থাকবে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। যেমন—
- বিদেশি সরকার বা উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ।
- আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ বা ফেলোশিপের আওতায় মাস্টার্স ও পিএইচডি অধ্যয়ন।
- বিশেষ কারিগরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (PSI) ও ফ্যাক্টরি অ্যাক্সেপটেন্স টেস্ট (FAT) সংক্রান্ত বিদেশ সফর।
এসব ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং যৌক্তিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন ভবন নির্মাণেও কড়াকড়ি
পরিচালন বাজেট থেকে নতুন আবাসিক, অনাবাসিক বা অন্যান্য ভবন নির্মাণ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।
তবে যেসব ভবনের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ বা তার বেশি সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে শেষ করা যাবে।
ভূমি অধিগ্রহণে নতুন নিয়ম
পরিচালন বাজেটের আওতায় কোনো ধরনের ভূমি অধিগ্রহণে অর্থ ব্যয় করা যাবে না।
অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে।
থোক বরাদ্দ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা
চলতি অর্থবছরে পরিচালন বাজেটের থোক বরাদ্দ থেকে কোনো অর্থ ব্যয় করা যাবে না।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের অধীনে সংরক্ষিত “বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা” খাতের অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে ব্যবহার করা যাবে।
আগেই অনুমোদিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে কী হবে?
যেসব উন্নয়ন প্রকল্প এই নতুন নির্দেশনা জারির আগেই অনুমোদন পেয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী শর্ত শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, পূর্ব অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে থেমে যাবে না।
কেন এই ব্যয় সংকোচন?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে সরকারের সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—
- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো
- সরকারি ব্যয় দক্ষভাবে পরিচালনা
- উন্নয়ন প্রকল্পে অগ্রাধিকার নির্ধারণ
- সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা
এই বাস্তবতায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যবহারের লক্ষ্যেই নতুন নীতিমালা কার্যকর করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের নতুন ব্যয়সংকোচন নীতিমালা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সরকারি অর্থ ব্যবহারে এখন থেকে আরও কঠোর জবাবদিহি ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। যানবাহন ক্রয়, বিদেশ সফর, নতুন ভবন নির্মাণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে সরকার সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায়। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যানবাহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের টেকসই সরকারি পরিবহন ব্যবস্থার দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
করপোরেটনিউজ২৪,জিএন, এইচ এইচ