EMail: corporatenews100@gmail.com
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সপ্তাহজুড়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। যদিও শুক্রবার লেনদেনের শুরুতে ব্রেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) তেলের দাম কিছুটা কমেছে, তবুও সপ্তাহ শেষে উভয় বেঞ্চমার্কই উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধির পথে রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, লাল সাগরে (Red Sea) জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে তেলের ট্যাংকারের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই তেলের সর্বশেষ দাম
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল পর্যন্ত লন্ডনভিত্তিক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৮২ ডলার বা ১.৮১ শতাংশ কমে ৯৮.৮৭ ডলারে নেমে আসে। তবে আগের দিন ব্রেন্টের দাম ৭ শতাংশ বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা মে মাসের পর প্রথমবারের মতো এই মাইলফলক স্পর্শ করে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) অপরিশোধিত তেলের দাম ১.৬০ ডলার বা ১.৭৪ শতাংশ কমে ৯০.৫৯ ডলার প্রতি ব্যারেলে লেনদেন হয়।
দৈনিক দর কিছুটা কমলেও পুরো সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম প্রায় ১২ শতাংশ এবং WTI-এর দাম প্রায় ৯.৭ শতাংশ বাড়ার পথে রয়েছে।
কেন বাড়ছে তেলের দাম?
বিশ্লেষকদের মতে, তেলের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে—
- লোহিত সাগরে তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি।
- ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি আরবের তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি।
- বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা।
- হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া।
- যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা।
জ্বালানি বিশ্লেষক জন ইভান্স বলেন, “বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদন কেন্দ্র এবং সরবরাহ রুটগুলো এখন যুদ্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই স্বল্পমেয়াদে তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।”
লাল সাগর ও হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলোর একটি। এর পরেই রয়েছে বাব আল-মান্দেব প্রণালি, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ইরান পূর্বে হুথিদের মাধ্যমে হুমকি দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাতে থাকে, তাহলে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
এদিকে, হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর দেশটি পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন : বাজারে আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম
ট্যাংকার চলাচল কমেছে
জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র একটি তেলবাহী ট্যাংকার অতিক্রম করেছে, যা মে মাসের পর সর্বনিম্ন।
এই পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা আরও জোরদার করেছে।
জেপি মরগানের পূর্বাভাস
বিনিয়োগ ব্যাংক JPMorgan বলেছে, তেল সরবরাহে বিঘ্ন প্রতিটি অতিরিক্ত মাস অব্যাহত থাকলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি আরও ৭ থেকে ৮ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, যদি সরবরাহ সংকট টানা তিন মাস স্থায়ী হয়, তাহলে ব্রেন্টের গড় মাসিক মূল্য প্রতি ব্যারেল ১১৪ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও বাড়াচ্ছে চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা ইউক্রেনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে হামলা চালিয়ে জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও লোডিং-আনলোডিং অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে জ্বালানি অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকলে এর প্রভাব পড়তে পারে—
- বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে
- পরিবহন ব্যয়ে
- বিমান ও শিপিং খাতে
- উৎপাদন খরচে
- আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি ব্যয়ে
বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ভবিষ্যতে জ্বালানি ব্যয় ও অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সূত্র: Reuters