EMail: corporatenews100@gmail.com
ঘাসফুল-প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত পরাণ রহমান কখনো নিজেকে আলোয় দাঁড়িয়ে দেখানোর ইচ্ছা পোষণ করেননি। অথচ তাঁর জীবনের আলো ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য মানুষের জীবনে। খ্যাতি, প্রতিপত্তি কিংবা সামাজিক মর্যাদার জন্য নয়—শুধু মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদে তিনি গড়ে তুলেছিলেন উন্নয়ন সংস্থা ‘ঘাসফুল’। তাঁর জীবন ছিল এক নীরব পদযাত্রা—যেখানে লক্ষ্য ছিল নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষ, দলিত শিশু।
পরাণ রহমান কখনো খ্যাতির পেছনে ছুটে যাননি। তিনি ‘ঘাসফুল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—নিজের নাম উজ্জ্বল করার জন্য নয়, বরং সমাজের অবহেলিত মানুষের জীবনে আলো জ্বালানোর জন্য। তাঁর জীবন ছিল প্রচারের বাইরে থাকা এক নিভৃত সাধনা।
তিনি ঘর ছেড়ে বাইরে এসেছিলেন একটিমাত্র বিশ্বাস নিয়ে—মানুষের কষ্টকে দূর থেকে দেখা যায় না, কষ্টের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সমাজের দলিত নারী ও শিশুকে ফুলের মতো বিকশিত হতে সাহায্য করা—এই বিশ্বাস থেকে তাঁর সংস্থার নাম রাখা হয় ‘ঘাসফুল’—যা পায়ের নিচেও বেঁচে থাকে, অথচ সৌন্দর্য ছড়ায়।
কুমিল্লার বিখ্যাত সুফি পরিবারে জন্ম নেওয়া পরাণ রহমান শৈশব থেকেই মানুষ ও সমাজকে গভীরভাবে অনুভব করতেন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালে, তিনি রিলিফ কার্যক্রমের মাধ্যমে ঘাসফুলের কর্মযাত্রা শুরু করেন। কিন্তু তাঁর কাছে প্রতিষ্ঠান কখনোই মুখ্য ছিল না; মুখ্য ছিল মানুষ।
পরাণ রহমানের মানবিক পথচলা শুরু হয় ১৯৭০ সালে। সত্তরের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় জনপদের ধ্বংসস্তূপ দেখে তিনি চুপচাপ থাকতে পারেননি। বড়কন্যা পারভীন মাহমুদ ও সহপাঠীদের সঙ্গে তিনি গঠন করেছিলেন একটি স্বেচ্ছাসেবী দল, যা পরিচালনা করেছিল ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রম। তখনই তাঁর মনে জন্ম নিল দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই উন্নয়নের উপলব্ধি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পরাণ রহমান একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে গ্রামে-গ্রামে ঘুরে যুবকদের যুদ্ধে পাঠানোর দায়িত্ব নেন। যুদ্ধশেষে নারীদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের দারিদ্র্য দেখে তিনি বীজরোপণ করেন—একটি উন্নয়ন সংস্থা গড়ে তোলার, যা কেবল পুনর্বাসন নয়, বরং মর্যাদার সঙ্গে জীবন দেওয়ার সুযোগ দেবে। তিনি মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতীত নারীদের পুনর্বাসন ও সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বহু কাজ করেন।
১৯৭২ সালে তিনি শুরু করেন ‘ঘাসফুল’, যেটি নামের মধ্যেই বহন করে সংগ্রাম, লড়াই ও আশাবাদের বার্তা। প্রাথমিকভাবে রিলিফ-ওয়ার্ক থেকে শুরু করে ঘাসফুলের কার্যক্রম ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়—পরিবার পরিকল্পনা, নারীর স্বাস্থ্যসেবা, দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসা, বীরঙ্গনা পুনর্বাসন, পরিবেশ ও কৃষি উন্নয়ন, শিশু সুরক্ষা, নারী ও যুব উন্নয়ন, প্রবীণ কল্যাণ, কমিউনিটি উন্নয়ন, আইন সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, এবং জলবায়ু অভিযোজন।
পরাণ রহমান বিশ্বাস করতেন—উন্নয়ন আসবে সমাজের নিচুতলা থেকে, তাদের অংশগ্রহণে তৈরি পরিকল্পনার মাধ্যমে। সেই দর্শনেই ঘাসফুল গড়ে উঠেছিল অংশগ্রহণমূলক ও বহুমুখি উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে। আজ ঘাসফুল দেশের আটটি জেলায় বিস্তৃত। একজন মানুষের মানবিক স্বপ্ন আজ পরিণত হয়েছে একটি চলমান আন্দোলনে—যা মানুষের অন্তরে সুগন্ধ ছড়িয়ে দেয় মানবিক, ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন নিয়ে। বটবৃক্ষের মতো ছায়া হয়ে এটি লক্ষ লক্ষ উপকারভোগীর জীবনে নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং আশা বয়ে দিচ্ছে।
পরাণ রহমান সম্পর্ক গড়তে জানতেন, ভাঙতে নয়। সমাজে তিনি যে শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, সেই শ্রেণির আত্মীয়তা ও সামাজিকতার বন্ধন যেমন করে যত্নসহকারে আগলে রাখতেন, ঠিক তেমনি সমান মমতায় ধরে রাখতেন সমাজের তৃণমূল মানুষের হাত। আমাদের সমাজে সাধারণত দেখা যায়—যতদিন কারও যৌবন, শক্তি ও কর্মক্ষমতা থাকে, ততদিন তার কদর থাকে; দুর্বল সময় এলে মানুষ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে আমরা প্রায় স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিই। কিন্তু পরাণ রহমানের কাছে এটি কখনোই স্বাভাবিক ছিল না।
তিনি একজন শিশুকে যেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন, তেমনি একজন প্রবীণকেও সমান চোখে দেখতেন। সমাজের, পরিবারের প্রত্যেক মানুষই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর কাছে এসব সম্পর্ক ছিল এক অমূল্য সম্পদ—আত্মার বন্ধন। প্রত্যেকের মানব মর্যাদায় তিনি গভীর বিশ্বাসী ছিলেন। উন্নয়ন মানে তাঁর কাছে কখনো খ্যাতি বা প্রতিপত্তি ছিল না; উন্নয়ন মানে ছিল মানুষের শান্তি, পারিবারিক সমৃদ্ধি এবং মানবিক মর্যাদাপূর্ণ জীবন।
পরাণ রহমান সমন্বিত উন্নয়নে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর উন্নয়ন দর্শনের বিস্তৃতি ছিল গর্ভবতী নারী থেকে শুরু করে প্রবীণ মানুষের শেষযাত্রা পর্যন্ত। তাঁর মূলমন্ত্র ছিল—মানবজীবনের কোনো স্তর যেন সংস্থার সেবা থেকে বাদ না পড়ে। পরাণ রহমান ছিলেন এমন এক উন্নয়ন-দর্শনের প্রবক্তা, যা মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরকে—গর্ভধারণকাল থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত এমনকি দাফন-কাফন পর্যন্ত—আবৃত করে। তিনি সংখ্যাগত সাফল্যের চেয়ে গুণগত পরিবর্তনকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। তাঁর ভাষায়— “উন্নয়ন মানে কেবল সংখ্যা বাড়ানো নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনের মান উন্নত করা।” তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি পরিবারের জন্য উন্নয়ন হতে হবে জীবনচক্রভিত্তিক—যা তিনি “চাইল্ড-টু-গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস অ্যাপ্রোচ” নামে অভিহিত করেছিলেন।
সম্ভবত সে কারণেই তিনি তাঁর বিশাল কর্মীবাহিনীর প্রতিটি মানুষের আলাদা খোঁজ রাখতে পারতেন। শুধু চাকরি নয়—তাঁদের পারিবারিক জীবন, সামাজিক স্থিতি, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতেন। কর্মীদের স্ত্রী, সন্তান, এমনকি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খোঁজখবর নেওয়াও তাঁর কাছে দায়িত্বের অংশ ছিল। বহু সমাজসেবককে আমরা দেখি, যাদের বক্তব্য আর বাস্তব আচরণের মধ্যে বিস্তর ফারাক। কিন্তু পরাণ রহমান ছিলেন ভেতরে-বাইরে এক ও অভিন্ন। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, সেটাই বলতেন। কপটতা তিনি ঘৃণা করতেন।
তাঁর মানবিকতা ছিল প্রজন্ম পেরিয়ে বয়ে চলা এক স্নেহনদী। যাঁকে একবার সহায়তার হাতে মায়া–মমতায় আগলে নিয়েছেন, তাঁকে তিনি কখনোই একা হতে দেননি। বরং সেই সহায়তা ব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে সন্তান, নাতি–নাতনি পর্যন্ত নীরবে প্রবাহিত হয়েছে—নদীর মতোই নিচের দিকে, গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন। পরাণ রহমানের দয়াদৃষ্টি ছিল এমনই প্রজন্মবাহিত।
কুমিল্লার ফজুতুন্নেসা তাঁর বাসায় কাজ করতেন। সময়ের ধারায় সেই সম্পর্ক কেবল শ্রমের সীমায় আটকে থাকেনি। তাঁর মেয়ে রমুজা বেগম ঘাসফুলে পেলেন সম্মানজনক স্থায়ী চাকরি। প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটিসহ পূর্ণ মর্যাদায় তিনি তাঁর কর্মজীবন শেষ করেন। রমুজার মেয়ে মনোয়ারা চাকরি পান ঘাসফুল স্কুলে, আর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলে রবিউল সংস্থার এসএস পদে কাজের সুযোগ পায়। আজও মনোয়ারা ঘাসফুলে কর্মরত। এ যেন কোনো অনুগ্রহের গল্প নয়—এ এক মানবিক উত্তরাধিকার, যেখানে তিন প্রজন্ম পরাণ রহমানের জীবদ্দশায় তাঁর স্নেহছায়ায় নিরাপদে বেড়ে উঠেছে।
পটিয়ার অনিল দে ছিলেন পরাণ রহমানের মানবিকতার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অনিল দে পৃথিবী ছেড়ে গেলেও তাঁর পরিবার কখনোই পরাণ রহমানের স্নেহছায়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। অনিল দে’র দুই ছেলে ঘাসফুলে দীর্ঘ ও সম্মানজনক কর্মজীবন কাটিয়েছেন। বড়ছেলে অরুণ বাবু প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটিসহ পূর্ণ মর্যাদায় অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু এই স্নেহধারা সেখানেই থেমে থাকেনি— অরুনবাবুর দুই ছেলেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে পরাণ রহমানের বড়কন্যার উদ্যোগে।
আজ অনিল দে’র ভাতিজা ও নাতি মিলিয়ে প্রায় বারো থেকে পনেরজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও স্থিতির পেছনে নীরবে, অথচ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে পরাণ রহমানের নাম। এখানে অনিল বাবুর তিন প্রজন্ম পরাণ রহমানের বদান্যতা ও সানুকম্পা লাভ করেছে। সেই মানবিক ছায়া শুধু একটি পরিবারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি—তাঁর আশপাশের পাড়ার মানুষও পেয়েছে নিরাপদ জীবন, জীবন–জীবিকার সন্ধান।
চলাচলের জন্য পরাণ রহমান ব্যবহার করতেন একেবারে সাধারণ একটি বেবিট্যাক্সি। কিন্তু সেই সাধারণ যাত্রার ভেতরেই গড়ে উঠেছিল অসাধারণ কিছু সম্পর্ক। বেবিট্যাক্সির প্রথম চালক ইসমাইল ছিলেন তাঁর কাছে কেবল একজন কর্মচারী নন—সন্তানের মতোই আপন। ইসমাইল হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলে তিনি শূন্যতায় মুখ ফিরিয়ে নেননি; বরং দায়িত্ব তুলে নেন তার পরিবারের জীবনের ভার। ইসমাইলের মামা আবদুল আউয়ালকে তিনি চাকরির সুযোগ করে দেন।
আবদুল আউয়াল আজীবন নিঃশব্দ নিষ্ঠায় কাজ করে গেছেন। তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেছে তাঁর সন্তান ও নিকটাত্মীয়দের জীবন–জীবিকার পথও। তাঁর ছেলেরা—শাহ আলম ও নুরুমিয়া—দীর্ঘদিন সম্মানের সঙ্গে গাড়িচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আরেক ছেলে নুরুল হকও ঘাসফুলে কাজ করে নিজের জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলেন।
শাহ আলম ছিলেন পরাণ রহমানের শেষদিনগুলোর নীরব সঙ্গী—শুধু গাড়ির চালক নন, বরং সার্বিক দেখাশোনার একজন বিশ্বস্ত মানুষ। পরাণ রহমানও তাঁকে আগলে রেখেছেন সন্তানের মতো স্নেহে। এই সম্পর্কগুলো কোনো চুক্তির ফাঁদে বাঁধা ছিল না—এ ছিল হৃদয়ের সম্পর্ক, মানুষে মানুষে পাশে দাঁড়ানোর এক গভীর মানবিক ভাষা। শুধু শাহ আলম নন, তাঁর মেয়ের বিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে জামাই ও শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন পরাণ রহমান—নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে, মানুষের মতো মানুষ হয়ে।
নিপীড়িত নারী সুফিয়াকে উদ্ধার করে তিনি আয়া পদে চাকরি দিয়েছেন। আজ সেই সুফিয়া সমাজে একজন সম্মানিত নারী—সন্তান, নাতি–নাতনি নিয়ে নিরাপদ ও প্রতিষ্ঠিত জীবনের অধিকারী। আরেকজন ‘সুফিয়া জুনিয়র’—যাকে তিনি নিজের মেয়ের মতো করে বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিরাপত্তার ছায়ায় রেখেছেন।
এরকম অসংখ্য মানুষের অসংখ্য গল্প – পরাণ রহমানের জীবদ্দশায় তাঁর ছায়ায় গড়ে উঠেছিল। এধরণের অসাধারণ কিছু গুণাবলী নিয়ে পরাণ রহমান অত্যন্ত সাধারন জীবন-যাপন করে যেতেন। এসব গল্প কোনো দয়ার প্রদর্শনী নয়; এগুলো এক মানুষের গভীর মানববোধের নীরব সাক্ষ্য। পরাণ রহমানের মানবিকতা ছিল এমন এক উত্তরাধিকার, যা তার নামের মতোই মানুষের পরাণে জাগিয়ে রাখে। আজও বহু মানুষের জীবনে তিনি বেঁচে আছেন- নিঃশব্দে, স্থিরতায় এবং নিরাপত্তায়।
পরাণ রহমান বিশ্বাস করতেন—উন্নয়ন মানে শুধু প্রকল্প বা পরিসংখ্যান নয়; উন্নয়ন মানে মানুষকে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার সুযোগ করে দেওয়া। সে কারণেই তিনি আজও বেঁচে আছেন অসংখ্য মানুষের জীবনে, স্মৃতিতে ও স্বপ্নে।
পরাণ রহমান উন্নয়ন সেক্টরে এক কিংবদন্তি, অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। এ সেক্টরে তিনি বহু নতুনধারার উদ্ভাবক—যেগুলো আজও প্রাসঙ্গিক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নব্বইয়ের দশকে পোষাকশিল্পে তিনি সর্বপ্রথম পোষাক শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা এবং অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। সেই উদ্যোগই আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জন্য মডেল হয়ে উঠেছে।
তিনিই সর্বপ্রথম চট্টগ্রামে উপকূলীয় জেলে ও তাদের পরিবারের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজ শুরু করেন, ১৯৮২ সালে। সেইসঙ্গে তিনি সমসাময়িক সময়ে হরিজন সম্প্রদায় ও তৃণমূল শিশুদের শিক্ষায় ঘাসফুলের উদ্যোগে স্কুল প্রতিষ্ঠা, নিরাপদ মাতৃত্ব, বীরাঙ্গনা ও নিপীড়িত নারীদের পুনর্বাসন, আইনী অধিকার ও প্রবীণদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী উদ্যোক্তা তৈরীসহ নানাক্ষেত্রে দিকপাল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এ সমস্ত কর্মকাণ্ডে পরাণ রহমান উন্নয়ন সেক্টরে স্মরণীয় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন—যার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, অনন্য নেতৃত্ব এবং সমাজের প্রতি অবদানের গল্প আজও প্রেরণার উৎস।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে মনে হয়—পরাণ রহমান থেমে যাননি। তিনি রয়ে গেছেন ঘাসফুলের প্রতিটি কর্মীর ভেতরে, প্রতিটি শিশুর হাসিতে, প্রতিটি নারীর আত্মমর্যাদায়। তিনি ছিলেন—মানুষের জন্য মানুষের মতো করে বেঁচে থাকা এক বিরল জীবন।
পরাণ রহমান এসব গুণের কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। নিজের নশ্বর জীবনকে তিনি রূপান্তরিত করেছিলেন নন্দিত এক অবিনশ্বর জীবনে—যা আজও আমাদের মাঝে বাতাসের মতো মৃদু, অম্লানভাবে বয়ে চলে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে এ অনুভূতি জাগে—পরাণ রহমান সত্যিই চলে যাননি। তিনি আজও রয়ে গেছেন সেইসব মানুষের হৃদয়ে, যাদের ভাগ্য তিনি নিঃশব্দে বদলে দিয়েছিলেন।
তিনি আজও বেঁচে আছেন ঘাসফুলের প্রতিটি কর্মীর ভেতরে, বঞ্চিত জনপদে প্রতিটি শিশুর হাসিতে, প্রতিটি নারীর আত্মমর্যাদায়। মানুষের মায়া-মমতায়, ভালোবাসায় যে নন্দিত পথ তিনি রচনা করেছিলেন, সেই পথের নন্দিত পথিক হয়ে মৃত্যুর পরও তিনি চলছেন—মানুষের অন্তরে, অন্তরের গভীরে।
পরাণ রহমান ছিলেন মানুষের জন্য মানুষের মতো করে বেঁচে থাকা এক বিরল জীবন, এক অনন্য মানবতার অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর স্নেহ—সবকিছুই আজ আমাদের জন্য এক অম্লান আলোকধারা।
-সৈয়দ মামনূর রশীদ (উন্নয়নকর্মী ও লেখক)। totalmamungf@gmail.com