EMail: corporatenews100@gmail.com
স্বর্ণের বাজারে বর্তমানে যা ঘটছে, তা বাংলাদেশের বিনিয়োগ ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে স্বর্ণের দাম এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে যে অনেক বিনিয়োগকারীই দ্বিধায় পড়েছেন—এখন বিক্রি করবেন, নাকি আরও অপেক্ষা করবেন?
এক বছর আগে এই সময়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ মাত্র ১২ মাসে ভরিতে দাম বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার টাকা—যা বাংলাদেশের যেকোনো প্রচলিত বিনিয়োগ মাধ্যমের তুলনায় ব্যতিক্রমী।
স্বর্ণ কেন এত লাভজনক হয়ে উঠেছে?
বাংলাদেশে এমন কোনো বিনিয়োগ পণ্য নেই যেখানে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এক বছরের মধ্যে প্রায় সমপরিমাণ লাভ করা যায়। এই কারণেই স্বর্ণ এখন স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীদের নজরে।
যদিও দেশে সরাসরি গোল্ড ইনভেস্টমেন্ট স্কিম নেই, তবুও মানুষ অলংকার কিনেই স্বর্ণে বিনিয়োগ করে। এক ভরি অলংকার কিনতে গেলে স্বর্ণের দামের সঙ্গে গড়ে ১১ শতাংশ অতিরিক্ত খরচ (ভ্যাট ও মজুরি) যোগ হয়। তারপরও সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিতে সেই খরচ বহু আগেই উঠে গেছে।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও স্বর্ণের দাম
স্বর্ণের দাম সব সময়ই বৈশ্বিক অস্থিরতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। বিশ্বে যখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ছেড়ে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
সম্প্রতি—
-
ইরানে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা
-
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান
-
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ
এসব কারণেই স্বর্ণকে আবারও “নিরাপদ আশ্রয়” হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরই প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিহাসে প্রথমবার প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫,০০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।
দেশের বাজারে এর প্রভাব
বিশ্ববাজারের ঊর্ধ্বগতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারেও। কখনো ভরিতে ১,৫০০ টাকা, কখনো আবার এক লাফে ৫ হাজার টাকার বেশি দাম বাড়ছে। সামনে আরও সমন্বয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এই অবস্থায় অনেকেই পুরোনো অলংকার বিক্রির কথা ভাবছেন।
পুরোনো স্বর্ণ বিক্রি করলে লাভ কতটা?
পুরোনো অলংকার বিক্রির ক্ষেত্রে জুয়েলার্স সাধারণত—
-
ক্যারেট যাচাই করে
-
মোট ওজন থেকে গড়ে ১৭ শতাংশ বাদ দিয়ে দাম নির্ধারণ করে
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক,
আপনি ১০ বছর আগে ২২ ক্যারেটের এক ভরি অলংকার কিনেছিলেন ৭০ হাজার টাকায়।
বর্তমানে তা বিক্রি করলে আপনি পেতে পারেন প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
অর্থাৎ ভরিতে মুনাফা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।
২১ বা ১৮ ক্যারেট হলে অঙ্ক কিছুটা কম–বেশি হতে পারে।
সামনে দাম আরও বাড়বে?
বিশ্বের বড় বিনিয়োগ ব্যাংক ও বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস বলছে—স্বর্ণের দাম বাড়ার পথ এখনো শেষ নয়।
-
গোল্ডম্যান স্যাকস: ২০২৬ সালের শেষ দিকে প্রতি আউন্স স্বর্ণ ৫,৪০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে
-
লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (LBMA): চলতি বছরে সর্বোচ্চ দাম হতে পারে ৭,১৫০ ডলার
-
স্বাধীন বিশ্লেষক রস নরম্যান: দাম ৬,৪০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা
মাত্র পাঁচ বছর আগেও করোনাকালে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ২,০০০ ডলার। সেখান থেকে ৫,০০০ ডলারে পৌঁছানো—এটি সত্যিই ঐতিহাসিক।
তাহলে এখন বিক্রি করবেন নাকি অপেক্ষা করবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়।
-
আপনি যদি নিশ্চিত লাভ নিতে চান, তাহলে বর্তমান দাম পুরোনো অলংকার বিক্রির জন্য নিঃসন্দেহে ভালো সময়
-
আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী হন, তাহলে আরও কিছুটা অপেক্ষা করলেও ভবিষ্যতে বাড়তি লাভের সুযোগ থাকতে পারে
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে আপনার আর্থিক প্রয়োজন, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং সময়ের ওপর।
উপসংহার
স্বর্ণের বাজার এখন ব্যতিক্রমী এক সময় পার করছে। এমন মূল্যবৃদ্ধি খুব ঘনঘন দেখা যায় না। তাই আবেগ নয়, তথ্য ও হিসাবের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
স্বর্ণ বিক্রি করবেন কি করবেন না—সিদ্ধান্ত আপনার, তবে সময়টা যে গুরুত্বপূর্ণ, তা নিশ্চিত।
করপোরেট নিউজ২৪/ এসি