EMail: corporatenews100@gmail.com
মাহা হুসাইনি | গাজা সিটি, অধিকৃত ফিলিস্তিন
ঈদুল আজহার সময় এলেই আগে ব্যস্ত হয়ে উঠতেন মাজেন আল-জারজাওয়ি। গাজার পরিচিত পশুপালকদের একজন হিসেবে তিনি নিজের খামারে শত শত ভেড়া ও ছাগল লালন করতেন। ঈদের আগে পরিবারগুলো কোরবানির পশু কিনতে আসত, আর সেই মৌসুমই ছিল তার বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।
কিন্তু আজ সেই দৃশ্য অতীত।
এখন তিনি আর পশুর ব্যবসা করেন না। ছোট একটি রেস্টুরেন্ট চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আর সেখানে পরিবেশিত মাংসও আসে সীমিত পরিসরে অনুমোদিত হিমায়িত মাংস থেকে।
গাজা সিটির বাসিন্দা মাজেন বলেন, “এই সময়ে আমি সাধারণত প্রায় ২০০টি ভেড়া ও গরু বিক্রি করতাম। এখন আমার কাছে একটি প্রাণীও নেই।”
তার ভাষায়, “গাজায় এখন কোনো জীবিত পশু ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এখানে মানুষ যেন স্থায়ীভাবে বসবাস করছে না—এমন আচরণ করা হচ্ছে। কেবল ন্যূনতম পর্যায়ে জীবন চালিয়ে রাখার মতো জিনিস প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।”
ঈদুল আজহা: ত্যাগ ও ভাগাভাগির উৎসব
ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এ সময় সামর্থ্যবান মুসলমানরা ঈদের নামাজের পর ভেড়া, ছাগল, গরু বা উট কোরবানি করেন। পরে সেই মাংস পরিবার, প্রতিবেশী ও অভাবী মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
যুদ্ধের আগে ঈদের মৌসুমে চাহিদা মেটাতে গাজায় প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো।
কিন্তু টানা তৃতীয় বছরের মতো এবারও গাজার মানুষ ঈদের অন্যতম প্রধান এই ধর্মীয় অনুশীলন থেকে কার্যত বঞ্চিত হতে চলেছেন।
ধ্বংস হয়ে গেছে গাজার পশুসম্পদ খাত
গাজার বাণিজ্য ও শিল্প চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর গাজার পশুপালন খাতের ৯০ শতাংশেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
শুধু স্থানীয় উৎপাদন নয়, জীবিত পশু প্রবেশও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে।
ফলাফল হিসেবে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধি।
যুদ্ধের আগে যেখানে একটি ভেড়ার দাম ছিল প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার, এখন অল্প কিছু অবশিষ্ট পশুর দাম পৌঁছেছে প্রায় ৭ হাজার ডলারে।
মাজেন বলেন, “আমি পশু বিক্রি বন্ধ করেছি। কারণ গাজায় এখন পশু এতটাই কম যে এগুলো আর বাজারের জন্য রাখা সম্ভব নয়।”
তিনি জানান, বিদেশে থাকা ফিলিস্তিনিরা এখনও আত্মীয়দের জন্য কোরবানির পশু কিনতে যোগাযোগ করেন। তবে তিনি তাদের ভিন্ন পরামর্শ দেন।
“আমি বলি, একটি ভেড়া কেনার বদলে ৫০ কেজি হিমায়িত মাংস কিনুন। একটি পশুর পেছনে যে অর্থ লাগবে, তা দিয়ে একটি পরিবারের অন্য প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।”
যুদ্ধের আঘাতে শুধু পশু নয়, ভেঙে পড়েছে পুরো ব্যবস্থা
খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম, পশু চিকিৎসাকেন্দ্র—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খাদ্য সংকটের কারণে পশু বাঁচিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
মাজেন বলেন, “আমরা পশু বাঁচাতে যা পেয়েছি তাই খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি। এমনকি পাস্তাও খাওয়াতে হয়েছে।”
তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বোমা হামলা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে।
তিনি বলেন, “আমার অনেক ভেড়া মারা গেছে পাশের বাড়িতে হামলার পর। শুধু আমি নই, অধিকাংশ খামারি একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।”
বারবার স্থানত্যাগের কারণে মানুষ তাদের পশু দেখাশোনা করতে পারেনি। অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে পশু বিক্রি করেছেন অথবা জবাই করে ফেলেছেন।
“আমি যখন এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম, তখন পশুগুলো দ্রুত বিক্রি করতে হয়েছিল। কারণ বোমার মধ্যে ফেলে রেখে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।”
তিনি বলেন, “শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ছিল—নিজের স্ত্রী ও সন্তানকে বাঁচাব, নাকি পশুর দেখভাল করব?”
‘এখন আর ঈদ বলে কিছু নেই’
গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে যেখানে প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল, এখন তা কমে মাত্র ৩ হাজারে নেমে এসেছে।
গরু ও বাছুর প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া জানান, যেসব পশু এখনও বেঁচে আছে, সেগুলোর বেশিরভাগই যাযাবর পশুপালকদের কাছে রয়েছে এবং ঈদের বাজারে বিক্রির জন্য পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, পানির উৎস ও কূপ পরিচালনায় বাধা থাকায় খাতটি পুনরুদ্ধারের বাস্তব সুযোগও নেই।
উৎসবের আনন্দ হারিয়ে ফেলছে মানুষ
গাজার স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা বলেন,
“মনে হয় আমরা তিন বছর ধরে ঈদ পালন করিনি।”
তার মতে, ঈদের মূল অনুভূতিই ছিল কোরবানি এবং অন্যদের সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।
“কোরবানি নেই, ভাগাভাগি নেই—তাহলে ঈদের অনুভূতিও নেই।”
তিনি বলেন, অনেক পরিবার এখন প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
“অনেক মানুষ এক বছরের বেশি সময় ধরে হিমায়িত মাংসও খেতে পারেনি।”
খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক চাপ
জাতিসংঘ সমর্থিত খাদ্য নিরাপত্তা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ গাজার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে পড়েছেন।
সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, ত্রাণ প্রবেশের সীমাবদ্ধতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
আবুরিয়ালা মনে করেন, পশু প্রবেশ বন্ধ থাকা শুধু ধর্মীয় অনুশীলন নয়—পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তার ভাষায়, “যদি পশু গাজায় প্রবেশ করতে পারত, তাহলে পশুচিকিৎসক, খামারি, কৃষক, কসাই, রেস্টুরেন্ট মালিক—হাজারো মানুষের জীবিকা টিকে থাকত।”
ঈদুল আজহা সাধারণত ত্যাগ, ভাগাভাগি ও সম্প্রদায়ের বন্ধনের প্রতীক। কিন্তু গাজায় বহু মানুষের কাছে সেই উৎসব এখন স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে। কোরবানির পশু নেই, বাজার নেই, সামর্থ্য নেই—ফলে ঈদের আনন্দও যেন হারিয়ে গেছে।
গাজার মানুষের জন্য এবারের ঈদও তাই উৎসবের নয়—বরং টিকে থাকার আরেকটি দিন।