USA news 24/7
Stay Ahead with the Latest in Business

রাজনীতির ইতিবাচক চিত্র অনেকাংশেই ম্লান

রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হলে সমাজকে আলোকিত করতে পারে

।।সোহেল তাজ।।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে রাজনীতি শুধু ক্ষমতা দখলের কোনো কৌশল ছিল না; বরং এটি ছিল সমাজ গঠন, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার একটি মহৎ প্রক্রিয়া। রাজনীতি মানুষের চিন্তা, চেতনা, মূল্যবোধ ও নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে যুগে যুগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

একসময় রাজনীতি মানেই ছিল আদর্শ, ত্যাগ, নৈতিকতা ও জনকল্যাণের প্রতীক। রাজনৈতিক নেতারা ছিলেন জাতির পথপ্রদর্শক, সমাজের শিক্ষক এবং মানবতার সেবক। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই রাজনীতির চিত্র আজ অনেকাংশেই বদলে গেছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতি হয়ে উঠেছে ক্ষমতার লড়াই, ব্যক্তিস্বার্থ, প্রতিহিংসা ও দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দু। ফলে রাজনীতির যে সৌন্দর্য, আদর্শ ও চারিত্রিক শক্তি একসময় মানুষকে অনুপ্রাণিত করত, তা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।

রাজনীতি শব্দটির মূল অর্থ হলো রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনার নীতি। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক Aristotle রাজনীতিকে “সর্বোচ্চ কল্যাণের বিজ্ঞান” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর মতে, রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, রাজনীতির মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন কিংবা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের পেছনে রাজনীতির ইতিবাচক ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

বাংলাদেশের ইতিহাসেও রাজনীতির গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ—সবকিছুর পেছনে ছিল আদর্শনির্ভর রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সেই সময়ের রাজনীতি তরুণদের মাঝে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করত। ছাত্ররাজনীতি ছিল নেতৃত্ব তৈরির একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। একজন রাজনৈতিক কর্মীকে সমাজের মানুষের সুখ-দুঃখ বোঝার শিক্ষা দেওয়া হতো। রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও দেশকে এগিয়ে নেওয়া।

একসময় রাজনৈতিক নেতারা সাধারণ মানুষের জীবনযাপন করতেন। তাঁরা জনগণের কষ্ট অনুভব করতেন এবং মানুষের জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিতেন। তাঁদের বক্তব্যে ছিল সততা, আচরণে ছিল বিনয় এবং কর্মে ছিল দেশপ্রেম। মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের অনুসরণ করত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকে। কারণ তখন রাজনীতি ছিল নৈতিকতা ও আদর্শের চর্চার ক্ষেত্র। একজন নেতা তাঁর চরিত্র, ত্যাগ ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতেন।

রাজনীতি শুধু নেতৃত্ব তৈরির মাধ্যম নয়; এটি সমাজকে সচেতন ও সৃষ্টিশীল করে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। রাজনৈতিক চর্চা মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শেখে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মূল্য বুঝতে শেখে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণ সমাজ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। এভাবে রাজনীতি একটি জাতির চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করে।

সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রেও রাজনীতির প্রভাব গভীর। সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, গান, কবিতা—সবকিছুতেই রাজনৈতিক চেতনার ছাপ দেখা যায়। ইতিহাসে বহু কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পী সমাজ পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক চেতনাকে কাজে লাগিয়েছেন। রাজনীতি মানুষের মনে নতুন স্বপ্ন ও নতুন সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। তাই একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ জাতির সৃজনশীল বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাই, রাজনীতির সেই ইতিবাচক চিত্র অনেকাংশেই ম্লান হয়ে গেছে। আজকের রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় অনেকেই নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিসর্জন দিচ্ছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা সমাজে বিভাজন ও সহিংসতা সৃষ্টি করছে। ফলে রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।

বর্তমান সময়ে রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো আদর্শের অভাব। অনেক রাজনৈতিক কর্মী রাজনীতিতে আসছেন শুধু ক্ষমতা, অর্থ বা প্রভাব অর্জনের উদ্দেশ্যে। জনসেবার মানসিকতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর ফলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও স্বজনপ্রীতির মতো নেতিবাচক প্রবণতা রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। রাজনীতির এই অবক্ষয় তরুণ সমাজের মাঝেও হতাশা তৈরি করছে।

বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন স্পষ্ট। একসময় ছাত্ররাজনীতি ছিল মেধাবী ও আদর্শবান নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্র। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে তা সংঘর্ষ, দখলদারিত্ব ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তরুণদের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে ভীতি ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। এটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক।

রাজনীতির অবক্ষয়ের আরেকটি কারণ হলো সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাব। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ থেকে নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়ায় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও তার প্রভাব পড়েছে। মানুষ এখন দ্রুত সফল হতে চায়, কিন্তু আদর্শ ও নৈতিকতার পথে চলতে আগ্রহ কমে গেছে। ফলে রাজনীতিতেও সততা ও ত্যাগের পরিবর্তে সুযোগসন্ধানী মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বর্তমান রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইতিবাচকভাবে ব্যবহৃত হলে এগুলো মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু অনেক সময় ভুয়া তথ্য, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করছে। রাজনৈতিক আলোচনা গঠনমূলক না হয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিদ্বেষে পরিণত হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

তবে সবকিছুর পরও রাজনীতির গুরুত্ব কখনো কমে যায়নি। কারণ রাজনীতি ছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হতে পারে না। তাই রাজনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা জরুরি। এজন্য প্রয়োজন আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং সচেতন নাগরিক সমাজ।

প্রথমত, রাজনীতিতে নৈতিকতা ও আদর্শ ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনৈতিক নেতাদের উচিত ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া। রাজনীতিকে ব্যবসা বা ক্ষমতার হাতিয়ার না বানিয়ে জনসেবার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নেতাদের আচরণ ও বক্তব্যে শালীনতা ও সহনশীলতা থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তরুণ সমাজকে ইতিবাচক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক চর্চা ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ বাড়াতে হবে। তরুণদের শেখাতে হবে যে রাজনীতি মানেই সংঘর্ষ নয়; বরং এটি সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। মেধাবী ও সৎ তরুণরা রাজনীতিতে এলে দেশের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে।

তৃতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়াতে হবে। সততা, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও দেশপ্রেমের মতো মূল্যবোধ সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিও উন্নত হবে। কারণ সুস্থ রাজনীতি গড়ে ওঠে সুস্থ সমাজ থেকে।

চতুর্থত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রচারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

এছাড়া নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। শুধু রাজনৈতিক নেতাদের দোষারোপ করলেই হবে না; বরং জনগণকেও সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নিতে হবে। সমাজে অন্যায়, দুর্নীতি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। কারণ জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি সম্ভব নয়।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই রাজনীতি আদর্শ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে, তখনই সমাজ ও রাষ্ট্র উন্নতির পথে এগিয়েছে। আর যখন রাজনীতি ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, তখন সমাজে অস্থিরতা ও অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে। তাই আমাদের উচিত রাজনীতির মূল সৌন্দর্য ও আদর্শকে পুনরুদ্ধার করা।

রাজনীতি কোনো খারাপ বিষয় নয়; বরং এটি মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হলে সমাজকে আলোকিত করতে পারে। একজন সৎ ও আদর্শবান রাজনৈতিক নেতা হাজারো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারেন। তাই রাজনীতিকে ঘৃণা নয়, বরং শুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, রাজনীতি একসময় সচেতনতা, সৃষ্টিশীলতা ও চারিত্রিক নেতৃত্ব গঠনের এক মহৎ মাধ্যম ছিল।আজ নানা কারণে সেই রাজনীতির আদর্শ ও সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এখনও আশা হারানোর কারণ নেই। যদি আমরা নৈতিকতা, মানবিকতা ও জনকল্যাণকে রাজনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে রাজনীতি আবারও মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধার জায়গায় ফিরে আসবে। একটি সুস্থ, সুন্দর ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য আদর্শভিত্তিক রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই।



লেখক: সম্পাদক, মাসিক আলোর পথে

মতামতের জন্য সম্পাদক/প্রকাশক/করপোরেট নিউজ২৪ কর্তৃপক্ষ দায়ী নন। তা লেখকের নিজস্ব মতামত। 

Leave A Reply

Your email address will not be published.