USA news 24/7
Stay Ahead with the Latest in Business

কালোটাকার উৎস বন্ধ করুন-রিহ্যাব সভাপতি

দেশে কালোটাকার একটি বড় উৎস তৈরি হয়েছে সম্পত্তি নিবন্ধনের বিদ্যমান পদ্ধতি থেকে।

বাংলাদেশের আবাসন খাত বর্তমানে এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, বিক্রি কমে যাওয়া, ব্যাংক ঋণের সংকট, নীতিগত জটিলতা এবং কর ব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি মিলিয়ে খাতটি যেন দীর্ঘস্থায়ী মন্দার মুখে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রিয়েল এস্টেট খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের আবাসন সংকট ও নগরায়ণের বাস্তবতা বিবেচনায় বহুতল ভবনের বিকল্প নেই। প্রশ্ন উঠছে—যেখানে হংকং, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর কিংবা ব্যাংককের মতো শহরে ৪০-৫০ তলা ভবন স্বাভাবিক বিষয়, সেখানে বাংলাদেশে উচ্চ ভবন নির্মাণ নিয়ে এত আপত্তি কেন?

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিককে দেয়া এক সাক্ষাতকারে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল এ প্রশ্ন তোলেন।

আবাসন খাত এখনো সংকটের মধ্যে

ড. আলী আফজাল বলেন,  সত্য কথা বলতে, বাংলাদেশের আবাসন খাত এখন খুব ভালো অবস্থায় নেই। করোনা মহামারির পর থেকে এই খাত নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা।

নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সিমেন্ট, রডসহ প্রায় সব ধরনের কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আবাসন খাতের জন্য দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো সহজ নয়।

কেন কমে গেছে ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রি?

বর্তমানে ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আমার পর্যবেক্ষণ হলো, বিক্রি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

এর পেছনে একদিনের কোনো কারণ নেই। করোনার পর মানুষের হাতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ কমে যায়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ে। এরপর রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে অপেক্ষা করার প্রবণতা তৈরি করে। ফলে অনেকেই আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকেন। রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, আজ বাস্তবতা হলো, দেশের আবাসন বাজারে কেনাবেচা আগের তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।

ব্যবসাবান্ধব বাজেট এখন সময়ের দাবি

আমি মনে করি, বাজেট বড় না ছোট—এটা মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো, সেই বাজেট দেশের মানুষকে কতটা স্বস্তি দিতে পারছে এবং ব্যবসার পরিবেশ কতটা উন্নত করতে পারছে।

একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যবসায়ীদের কর ও ভ্যাটের অর্থ দিয়েই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। ব্যবসা ভালো থাকলে রাষ্ট্র ভালো থাকবে, আর রাষ্ট্র ভালো থাকলে ব্যবসাও এগিয়ে যাবে।

এই কারণে আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনের বাজেট অবশ্যই ব্যবসাবান্ধব হওয়া প্রয়োজন।

করব্যবস্থার অসংগতি কালোটাকা তৈরি করছে

রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজালের মতে, দেশে কালোটাকার একটি বড় উৎস তৈরি হয়েছে সম্পত্তি নিবন্ধনের বিদ্যমান পদ্ধতি থেকে।

ধরা যাক, একটি ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য আড়াই কোটি টাকা। কিন্তু উচ্চ করের কারণে সেটি অনেক কম মূল্যে রেজিস্ট্রি করা হয়। ফলে প্রকৃত লেনদেনমূল্য ও নিবন্ধিত মূল্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়।

এই ব্যবধানই অর্থনীতিতে অঘোষিত অর্থের জন্ম দেয়।

আমি মনে করি, যদি রেজিস্ট্রেশন ফি ও করহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা যায়, তাহলে মানুষ প্রকৃত মূল্যেই সম্পত্তি নিবন্ধন করবে। এতে সরকারও রাজস্ব হারাবে না, বরং অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অর্থ পাচারের প্রবণতা কমবে।

আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রয়োজন

বাংলাদেশের আবাসন খাতের আরেকটি বড় সংকট হলো অর্থায়ন।

বর্তমানে বেশিরভাগ ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা সীমিত। যেসব ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর সুদের হারও অনেক বেশি। ১৫-১৬ শতাংশ সুদে আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়।

বিশ্বের প্রায় সব উন্নত দেশে আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পসুদের ঋণব্যবস্থা রয়েছে। অনেক দেশে ২০ থেকে ২৫ বছরের কিস্তিতে অর্থায়ন করা হয়।

বাংলাদেশেও যদি সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে এই খাত নতুন প্রাণ ফিরে পাবে বলে মন্তব্য করেন রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল।

ড্যাপ পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন

রাজধানীর উন্নয়ন পরিকল্পনা বা ড্যাপ নিয়ে আমার কিছু প্রশ্ন রয়েছে।

আমি মনে করি, বর্তমান পরিকল্পনায় কিছু অসংগতি আছে, যা আবাসন খাতের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

একই শহরের ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ধরনের উচ্চতা সীমা ও ফ্লোর এরিয়া রেশিও নির্ধারণ করা হয়েছে। কোথাও বেশি সুযোগ, কোথাও কম সুযোগ। এতে বৈষম্য তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব ও ভূমির বাস্তবতা বিবেচনায় এসব নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল।

বহুতল ভবনই হতে পারে ভবিষ্যতের সমাধান

আমরা যদি বাস্তবতার দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সীমিত জমিতে বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসন নিশ্চিত করা।

এই বাস্তবতায় আমি মনে করি, পরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণের বিকল্প নেই।

হংকং, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর এবং ব্যাংককের মতো শহরগুলো সীমিত ভূমিকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে উল্লম্ব নগরায়ণের পথ বেছে নিয়েছে। তারা উচ্চ ভবন নির্মাণের মাধ্যমে আবাসন, ব্যবসা ও নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করেছে।

বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে।

অবশ্যই আমি বলছি না যে, যেখানে-সেখানে উঁচু ভবন নির্মাণ করতে হবে। নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, রাস্তা, পানি, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশনসহ সব অবকাঠামোগত সক্ষমতা নিশ্চিত করেই পরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে হবে।

কিন্তু শুধু উচ্চতার সীমাবদ্ধতা আরোপ করে আমরা দেশের আবাসন সংকটের সমাধান করতে পারব না।

বাংলাদেশের আবাসন খাত শুধু একটি ব্যবসা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং নগরায়ণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। ড. আলী আফজাল বলেন, আমি বিশ্বাস করি, সঠিক নীতিসহায়তা, যৌক্তিক করব্যবস্থা, সহজ অর্থায়ন এবং বাস্তবসম্মত নগর পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে আবাসন খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

আর আমাদের অবশ্যই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে—যদি বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ ও উন্নত শহরগুলো ৪০-৫০ তলা ভবনের মাধ্যমে নগরায়ণের সমাধান খুঁজে পায়, তাহলে বাংলাদেশে পরিকল্পিত বহুতল ভবন নিয়ে আপত্তির কারণ কী?

করপোরেটনিউজ২৪/জিএনএস/এসটি

Leave A Reply

Your email address will not be published.