EMail: corporatenews100@gmail.com
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলায় আবারও অনিশ্চয়তায় ইরান
যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার পর দেশজুড়ে আবারও বেড়েছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ। কিছুদিনের নাজুক যুদ্ধবিরতির কারণে যে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা নতুন করে শুরু হওয়া হামলা ও পাল্টা হামলায় ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে কথা বলা কয়েকজন ইরানি নাগরিক জানিয়েছেন, যুদ্ধের চেয়ে কম ভয়ংকর নয় অর্থনৈতিক সংকট। প্রতিদিন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, অথচ আয় কমছে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা নেই।
যুদ্ধের চেয়ে বড় সংকট অর্থনীতি
তেহরানের ৪০ বছর বয়সী আলোকচিত্রী সোমায়েহ জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে যে বাজার খরচ ছিল, এখন তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থনীতি। প্রতিদিন আমাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। একদিন যুদ্ধ, পরের দিন শান্তি—এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপ তৈরি করছে। আগামী দুই দিনের পরিকল্পনাও করতে পারছি না।”
তার মতে, শুধু যুদ্ধ নয়, অনিশ্চয়তাই মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।
ইন্টারনেট বন্ধে কর্মহীন হাজারো তরুণ
পশ্চিম ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশের সানানদাজ শহরের ৩০ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী আমির বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর ঠিক আগে তিনি বিয়ে করেছিলেন। নতুন সংসার শুরু করলেও যুদ্ধ তার জীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছে।
তিনি জানান, সরকার ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় তার মতো দূরবর্তী (রিমোট) কর্মীদের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
আমিরের ভাষায়, “ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আমি একেবারেই কাজ করতে পারিনি। আমার ওপর বিশাল ঋণের বোঝা তৈরি হয়েছিল। আমি যেহেতু রিমোট কাজ করি, তাই ইন্টারনেট ছাড়া আমার কোনো আয়ের পথ ছিল না।”
কয়েক দিন আগে নতুন কাজ পেলেও আবারও সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।
মুদ্রার অবমূল্যায়নে বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন ভেঙেছে
সানানদাজের ৩৪ বছর বয়সী মনোচিকিৎসক নাজানিন একসময় মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ইরানের রিয়ালের ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে সেই স্বপ্ন এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন,“হয়তো দুই মাসের জন্য তুরস্কে যেতে পারতাম, কিন্তু এখন সেই সামর্থ্যও নেই।”
নাজানিন জানান, যুদ্ধের সময় পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার মানসিক চাপ তাকে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত থেকেও পিছিয়ে দিয়েছে।
তার ভাষায়,“আমি যদি বিমান হামলায় মারা যাই, তাহলে আমার পরিবারের কী হবে—এই চিন্তা যেমন ছিল, তেমনি যদি আমার পরিবার বোমায় মারা যায়, তাহলে আমি কীভাবে একা বাঁচব—সেই ভয়ও আমাকে তাড়া করত।”
অর্থনৈতিক সংকটে থমকে গেছে অভিবাসনের পরিকল্পনা
তেহরানের আলোকচিত্রী সোমায়েহও একসময় দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
তিনি বলেন, এখন সুযোগ পেলেও আর ইরান ছাড়তে চান না। পরিবারের কাছাকাছি থাকাটাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে প্রতিটি পরিবারে
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ইরানের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।
বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষ ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার কারণে আয়ের প্রধান উৎস হারিয়েছেন।
মানসিক স্বাস্থ্যেও বাড়ছে সংকট
অবিরাম যুদ্ধের আশঙ্কা, বিমান হামলার ভয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক চাপ মিলিয়ে ইরানের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বসবাস করলে উদ্বেগ, হতাশা, অনিদ্রা এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)-এর মতো সমস্যা বাড়তে পারে।
ইরানের চলমান সংকট কেবল সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন একটি গভীর মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির ক্ষণস্থায়ী স্বস্তি ভেঙে নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষ আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট, ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে ইরানের লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন টিকে থাকার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা। রয়টার্স।