EMail: corporatenews100@gmail.com
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম শুক্রবার প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর সীমিত নৌ চলাচলের পাশাপাশি লোহিত সাগরের (Red Sea) রুট বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেল ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে।
প্রায় ৫% বেড়েছে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই তেলের দাম
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩.৯৮ ডলার বা ৪.৭৩ শতাংশ বেড়ে ৮৮.২১ ডলারে পৌঁছায়।
অন্যদিকে, ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) অপরিশোধিত তেলের দাম ৩.৮০ ডলার বা ৪.৮১ শতাংশ বেড়ে ৮২.৭৫ ডলার প্রতি ব্যারেলে ওঠে।
সপ্তাহজুড়ে উভয় সূচকই প্রায় ১৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির পথে রয়েছে। ব্রেন্ট টানা তৃতীয় সপ্তাহ এবং WTI টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে রয়েছে।
ডিজেলের বাজারেও রেকর্ড চাপ
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, ডিজেলের বাজারেও চাপ বেড়েছে।
শুক্রবার লো-সালফার গ্যাসঅয়েলের (ডিজেল) ফিউচারস ব্রেন্টের তুলনায় ৬৬.২৫ ডলার প্রিমিয়ামে লেনদেন হয়েছে, যা রেকর্ড পর্যায়ের রিফাইনিং মার্জিন নির্দেশ করে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে ডিজেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান অঞ্চল হওয়ায়, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং তেল শোধনাগারে হামলার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে তেল পরিবহন কমে গেছে
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
ইরানের হামলার আশঙ্কায় অনেক জাহাজ বিকল্প রুট ব্যবহার করছে অথবা যাত্রা বিলম্বিত করছে।
লোহিত সাগর বন্ধের আশঙ্কা
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে লোহিত সাগরের সম্ভাব্য অচলাবস্থা।
ইরান হুথি বিদ্রোহীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ ও এশিয়ায় জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
সৌদি আরব বিকল্প রুট ব্যবহার করছে
জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে সৌদি আরব ইতোমধ্যে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল ইয়ানবু (Yanbu) বন্দরে পাঠাচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব তার দৈনিক অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৭০ শতাংশেরও বেশি ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে পাঠাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইয়ানবু থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ লাখ ৭৩ হাজার ব্যারেল।
উপসাগরজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা
শুক্রবার সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি সেতু ও একটি বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। পাল্টা জবাবে ইরান কুয়েতের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় নতুন করে হামলার কথাও জানিয়েছে তেহরান। একই সময়ে কাতার জানায়, তাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের সময় ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষে একটি শিশু আহত হয়েছে বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দেখা দিলে—
- আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
- পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হতে পারে।
- ডিজেল ও বিমান জ্বালানির সংকট দেখা দিতে পারে।
- তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আবারও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালীতে সীমিত নৌ চলাচল এবং লোহিত সাগরের সম্ভাব্য অচলাবস্থার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক তেলের দামকে ঊর্ধ্বমুখী করেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বিশ্ব বাণিজ্য, পরিবহন খাত এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতিও নতুন করে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। Reuters