EMail: corporatenews100@gmail.com
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চল এশিয়া বর্তমানে একাধিক সংকটের মুখোমুখি। একদিকে অস্বাভাবিক গরম ও বৃষ্টির ঘাটতি কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে সার ও জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এর সঙ্গে সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি যুক্ত হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
কৃষিতে আবহাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব
ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শস্যভাণ্ডার থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার গম উৎপাদন অঞ্চল, থাইল্যান্ডের ধানক্ষেত এবং ইন্দোনেশিয়ার বিশাল পাম অয়েল বাগান—সবখানেই গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া কৃষি কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।
কৃষক ও বিশ্লেষকদের মতে, অনেক এলাকায় বৃষ্টির অভাবে জমি প্রস্তুত করা যাচ্ছে না। ফলে ধান, ভুট্টা, সয়াবিন, আখ ও অন্যান্য ফসলের আবাদ বিলম্বিত হচ্ছে। অনেক কৃষক আবাদ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এল নিনোর নতুন হুমকি
আবহাওয়াবিদরা ধারণা করছেন, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সাধারণত এল নিনোর কারণে এশিয়ায় গরম ও খরা বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব প্রথমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ায় দেখা দেয়। পরবর্তীতে এর প্রভাব উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ভারতে বিলম্বিত মৌসুমি বৃষ্টি
ভারতের আবহাওয়া বিভাগ সম্প্রতি মৌসুমি বৃষ্টির পূর্বাভাস আরও কমিয়ে দিয়েছে। দেশটির মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে বর্ষা মৌসুমে।
অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে গ্রীষ্মকালীন ফসলের বপন ইতোমধ্যেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্ষা দেরিতে শুরু হলে শুধু আবাদই বিলম্বিত হবে না, বরং পরবর্তীতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হলে উৎপাদনেও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধান উৎপাদনের ঝুঁকি
থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চাল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। কিন্তু চলমান খরা পরিস্থিতি এসব দেশের ধান উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
থাইল্যান্ডের কৃষকরা ইতোমধ্যেই দ্বিতীয় ধাপের ধান চাষ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। পর্যাপ্ত পানি না থাকলে বছরে একটি ফসলেই সীমাবদ্ধ থাকতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
ইন্দোনেশিয়ার জাভা, সুমাত্রা, কালিমানতান ও সুলাওয়েসির কিছু অঞ্চলে টানা ১০ দিনের বেশি সময় ধরে বৃষ্টি হয়নি। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, জুন মাসেও অনেক এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে।
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে
বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ইতোমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে গমের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান রপ্তানি কেন্দ্রগুলোতে চালের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে চালের বড় ধরনের সংকট না থাকলেও বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভারত বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ চাল রপ্তানি করে। যদি বর্ষা মৌসুমে উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তাহলে ভারত রপ্তানিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
সার সংকট আরও বড় উদ্বেগ
খরা পরিস্থিতির পাশাপাশি সার সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রভাব কৃষি খাতেও পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি সার সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, তাহলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ধান উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়াতেও অনিশ্চয়তা
সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে অস্ট্রেলিয়ায় দেরিতে হলেও গমের বপন শুরু হয়েছে। তবে কৃষকরা এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, আগামী তিন মাসে অনেক কৃষি অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় ২০ থেকে ৪০ মিলিমিটার পর্যন্ত কম বৃষ্টিপাত হতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ২০২৬ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, এল নিনো, যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকট এবং কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তা একসঙ্গে খাদ্য বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই পানি ব্যবস্থাপনা, সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের জন্য সহায়তামূলক নীতি গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
করপারেটনিউজ২৪/এইচ এইচ