EMail: corporatenews100@gmail.com
দেশীয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী শিল্পকে উৎসাহ দিতে ১০ বছরের কর সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে। এ উদ্যোগের ফলে দেশে উৎপাদিত ভোজ্যতেলের দাম কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, এ খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রথম পাঁচ বছর শতভাগ কর অব্যাহতি পাবে। পরবর্তী তিন বছর ৫০ শতাংশ এবং শেষ দুই বছর ২৫ শতাংশ হারে কর ছাড় সুবিধা দেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কর সুবিধার এ উদ্যোগ কৃষি খাতে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে এবং দেশীয়ভাবে ভোজ্যতেলের উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে ভোক্তা পর্যায়ে দামও সহনীয় হতে পারে।
দেশীয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদন: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ে। এ অবস্থায় দেশীয় তৈলবীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদন বাড়ানো হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান।
দেশে যেসব তৈলবীজ উৎপাদন হয়
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের তৈলবীজ চাষ হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- সরিষা (Mustard): সবচেয়ে বেশি চাষ হয় এবং সরিষার তেল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ভোজ্যতেল।
- সয়াবিন: শিল্পভিত্তিক ভোজ্যতেল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
- সূর্যমুখী: উচ্চমানের ভোজ্যতেল উৎপাদনে সম্ভাবনাময় ফসল।
- তিল (Sesame): পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ তেল উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
- চিনাবাদাম (Groundnut): ভোজ্যতেল ও খাদ্যশিল্পে ব্যবহৃত হয়।
দেশীয় তৈলবীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদনের সুবিধা
১. আমদানি নির্ভরতা কমবে
বর্তমানে পাম অয়েল ও সয়াবিন তেলের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
২. কৃষকের আয় বাড়বে
তৈলবীজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে কৃষকরা ধান বা অন্য ফসলের পাশাপাশি তৈলবীজ চাষে আগ্রহী হবেন।
৩. গ্রামীণ শিল্প ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে
তেলকল, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণন খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
৪. পুষ্টিগুণসম্পন্ন তেল পাওয়া যাবে
সরিষা, তিল ও সূর্যমুখীর তেলে ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিডসহ বিভিন্ন পুষ্টিগুণ রয়েছে, যা স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসে সহায়ক।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ
১. উৎপাদন কম
দেশে তৈলবীজের আবাদ ও ফলন এখনও চাহিদার তুলনায় কম। উন্নত জাত ও আধুনিক চাষাবাদের অভাব রয়েছে।
২. প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা সীমিত
অনেক এলাকায় আধুনিক তেল পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার অভাব রয়েছে।
৩. কৃষকের প্রণোদনা কম
ধানের তুলনায় তৈলবীজ চাষে লাভ কম মনে করলে কৃষকরা আগ্রহ হারান। বাজারজাতকরণেও সমস্যা থাকে।
৪. সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল
তৈলবীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও কারখানায় সরবরাহের সমন্বিত ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট উন্নত নয়।
কী করা যেতে পারে
১. উচ্চফলনশীল জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ
সরিষা, সূর্যমুখী ও সয়াবিনের উন্নত জাত কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। সেচ, যান্ত্রিক চাষ ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতি সম্প্রসারণ জরুরি।
২. কৃষকদের প্রণোদনা ও ন্যায্যমূল্য
তৈলবীজ চাষে ভর্তুকি, সহজ ঋণ এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করলে উৎপাদন বাড়বে।
৩. স্থানীয় তেলকল ও শিল্পে বিনিয়োগ
জেলা ও উপজেলাভিত্তিক আধুনিক তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তুললে কৃষক ও শিল্প উভয়ই লাভবান হবে।
৪. গবেষণা ও বাজার উন্নয়ন
দেশীয় তেলের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্র্যান্ডিং উন্নত করা প্রয়োজন।
সম্ভাবনার জায়গা
বাংলাদেশের জলবায়ু ও মাটির ধরন সরিষা, সূর্যমুখী ও তিল চাষের জন্য উপযোগী। কৃষি গবেষণা ও নীতিগত সহায়তা বাড়লে আগামী কয়েক বছরে দেশীয় তৈলবীজ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব। এতে ভোজ্যতেল খাতে আত্মনির্ভরতার পথে এগোনো সহজ হবে।
দেশীয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদন বাড়ানো শুধু কৃষি খাতের উন্নয়ন নয়, বরং অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব ভোজ্যতেল উৎপাদনে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারে।
কর্পোরেটনিউজ২৪/এসটি