EMail: corporatenews100@gmail.com
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মোড় তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই চুক্তি একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনেও এবার ইসরায়েলের ওপর কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে ইরান।
নেতানিয়াহুর নীরবতা নিয়ে আলোচনা
সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ঘোষণার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ নীরবতা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বহু বছর ধরে ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া নেতানিয়াহু চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই প্রকাশ্যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই নীরবতা ইঙ্গিত দেয় যে চুক্তির কিছু শর্ত ইসরায়েলের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে কী রয়েছে?
ভার্সাইয়ে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করবে। চুক্তিতে হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত রাখা, ইরানের ওপর কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তির আওতায় লেবাননে চলমান সংঘাতেরও অবসান চাওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হলে ইসরায়েলকে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হতে পারে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
ইরানের নতুন কৌশলগত সাফল্য
বহু বছর ধরে ইসরায়েলের কৌশল ছিল ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব সীমিত করার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে তেল আবিব।
কিন্তু সাম্প্রতিক চুক্তির মাধ্যমে ইরান এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আরও শক্তিশালী হতে পারে। ফলে ইরান শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, একটি নতুন ধরনের কূটনৈতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও অর্জন করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
লেবানন ইস্যুতে চাপের মুখে ইসরায়েল
চুক্তির অন্যতম আলোচিত অংশ হচ্ছে লেবাননকে কেন্দ্র করে নতুন শান্তি উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
এর ফলে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইসরায়েল নিরাপত্তার স্বার্থে সেনা মোতায়েন অব্যাহত রাখতে চাইলেও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন
দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হলেও সাম্প্রতিক এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্যকে সামনে নিয়ে এসেছে।
অনেক ইসরায়েলি বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি।
হরমুজ প্রণালী ও জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব
চুক্তির পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে আবারও তেলবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি শুধু যুদ্ধবিরতির একটি উদ্যোগ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বহু বছর ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রে থাকা ইরান এবার কূটনৈতিকভাবে নতুন অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে আগামী কয়েক সপ্তাহের আলোচনার ওপর। লেবানন, হিজবুল্লাহ, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে সমঝোতা কতদূর এগোয়, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
Source : How Iran turned the tables on Israel
করপোরেট নিউজ২৪/এসটি