EMail: corporatenews100@gmail.com
জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় সোলারের দিকে ঝুঁকছেন সাধারণ মানুষ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সোলার প্যানেলের বিক্রি বেড়েছে
ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দ্রুত বাড়ছে সৌরশক্তির ব্যবহার। তেলের ওপর নির্ভরশীল এই অঞ্চলের বহু পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বাড়তি জ্বালানি খরচ কমাতে সোলার প্যানেল স্থাপনের দিকে ঝুঁকছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ-পরবর্তী অনিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা অনেক ভোক্তাকে বিকল্প জ্বালানির দিকে আগ্রহী করে তুলেছে।
জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় সোলারের দিকে ঝুঁকছেন সাধারণ মানুষ
ফিলিপাইনের মারিকিনা শহরের বাসিন্দা হেইডি মেনডোজা অনলাইনে আর্থিক শিক্ষা বিষয়ক ক্লাস নেন। যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই তিনি নিজের বাড়িতে সৌর প্যানেল স্থাপন করেন।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের স্থপতি মিং কুয়াং চাইও একই কারণে নিজের বাড়িতে সোলার সিস্টেম স্থাপন করেছেন। তার মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহার এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা তাকে দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করেছে।
হরমুজ প্রণালীর প্রভাব
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব তেল পরিবহনের প্রধান রুট হলো হরমুজ প্রণালী।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং অনেক দেশে বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা দেখা দেয়।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তবুও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এখনও কাটেনি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সোলার প্যানেলের বিক্রি বেড়েছে
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৫.৫ গিগাওয়াট সৌরশক্তি সক্ষমতার প্যানেল রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এই পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের এক বছরের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।
চীনের সোলার প্যানেল নির্মাতারা এই চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও বাড়ছে সোলারের ব্যবহার
ফিলিপাইনের সোলার কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অর্ডারের সংখ্যা পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
জলবায়ু ও টেকসই নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়ির মালিকরা বিদ্যুৎ বিল কমানোর জন্য সোলার ব্যবহার করছেন, আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অপারেটিং খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সৌরশক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডে নতুন উদ্যোগ
মালয়েশিয়ায় সরকার আগে থেকেই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রণোদনা দিয়ে আসছে। তবে যুদ্ধের পর এই প্রবণতা আরও দ্রুত বেড়েছে।
কম্বোডিয়া সরকার এপ্রিল থেকে সৌর প্যানেল ও জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে দেশটিতে সোলার প্যানেল আমদানি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে থাইল্যান্ড সরকার বাড়ির ছাদে স্থাপিত সোলার প্যানেল থেকে অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রির সুযোগ তৈরির জন্য নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করার কাজ করছে।
ইন্দোনেশিয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য
ইন্দোনেশিয়া এখনও প্রধানত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। তবে দেশটির সরকার আগামী তিন বছরের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
যদিও অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন যে গ্রিড-সংযুক্ত সোলার সিস্টেম স্থাপনের প্রক্রিয়া এখনও জটিল, তবুও সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
ভবিষ্যতে আরও বাড়বে সোলারের চাহিদা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যুদ্ধ সাময়িকভাবে শেষ হলেও ভবিষ্যতে ভূ-রাজনৈতিক সংকট আবারও দেখা দিতে পারে। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরশক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এই ঝোঁক ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে এবং অঞ্চলের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে।
ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলেছে। বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং বাড়তি জ্বালানি ব্যয় থেকে রক্ষা পেতে মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্রমেই সৌরশক্তির দিকে ঝুঁকছে। ফলে সোলার প্যানেলের চাহিদা, বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
করপোরেট/এসটি