EMail: corporatenews100@gmail.com
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধনীদের সংখ্যা বাড়লেও দেশের ব্যাংক খাতে বড় অংকের ব্যক্তিগত আমানত কমছে—এমন একটি বৈপরীত্যপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ক্রেডিট সুইসের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ রয়েছেন, যাদের সম্পদের পরিমাণ ১০ লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি। অর্থাৎ, টাকার অঙ্কে যা প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ টাকা।
কিন্তু বিপরীত চিত্র দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে দেশে ২৫ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যক্তিশ্রেণীর ব্যাংক হিসাব ছিল মাত্র ১০৪টি, যা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ২২৩টি।
কেন ব্যাংকে টাকা রাখছেন না অতিধনীরা?
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের ধনী ও অতিধনী শ্রেণীর একটি বড় অংশ ইচ্ছাকৃতভাবেই ব্যাংকে বড় অংকের টাকা রাখছেন না। CorporateNews24-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন,
> “৪৭৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে মাত্র শতাধিক ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে ২৫ কোটির বেশি টাকা থাকা অবিশ্বাস্য। এর মানে হলো—অতিধনীরা ব্যাংক এড়িয়ে চলছেন বা ঝুঁকি মনে করছেন।”
তার মতে, অনেক ধনী ব্যক্তি আয়কর রিটার্নে প্রকৃত আয় দেখান না। আবার কেউ কেউ অবৈধ আয়ের কারণে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে ভয় পান। ফলে তারা জমি, ফ্ল্যাট, স্বর্ণ, ডলার কিংবা বিদেশে সম্পদ কিনে অর্থ সংরক্ষণ করছেন।
বড় অংকের আমানত কমছে দ্রুত
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২৫ কোটি টাকা জমা থাকা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৬,৯৩২টি। এসব হিসাবে মোট জমা ছিল প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যক্তিগত হিসাবের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২৬টিতে, যেখানে এক বছর আগে ছিল ৭২টি।
কোটি টাকার হিসাব মানেই কোটিপতি নয়
দীর্ঘদিন ধরে দেশে “কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়ছে” এমন ধারণা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক এবার প্রথমবারের মতো ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব আলাদা করে প্রকাশ করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি কোটি টাকার হিসাব থাকলেও এর মধ্যে মাত্র ২৯ শতাংশ ব্যক্তিশ্রেণীর, বাকি ৭১ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যবসায়িক হিসাব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান CorporateNews24-কে বলেন, “কোটি টাকার হিসাব বাড়া মানেই কোটিপতির সংখ্যা বাড়া—এই ধারণা সঠিক নয়। নতুন তথ্য সেই বিভ্রান্তি দূর করবে।”
সুইস ব্যাংকে বাড়ছে বাংলাদেশিদের অর্থ
দেশের ব্যাংকে যখন বড় অংকের ব্যক্তিগত আমানত কমছে, তখন উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে সুইজারল্যান্ডে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, **২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ সুইস ফ্রাঁ**, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় **৯ হাজার কোটি টাকা**।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ব্যাংক সংকটের প্রভাব
একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে CorporateNews24-কে জানান, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্রেপ্তার, সম্পদ জব্দ ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি আগেই টাকা সরিয়ে নিয়েছেন বা বিদেশে পাঠিয়েছেন।
সমাধান কী?
অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে,
“আইনি হয়রানি ও কর-ভয়ের সংস্কৃতি দূর না হলে ধনীরা ব্যাংকে ফিরবেন না। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফেরানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
তিনি বলেন, নিরাপদ, স্বচ্ছ ও ন্যায্য আর্থিক পরিবেশ তৈরি করা গেলে বৈধ অর্থ আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরবে—যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন : দুর্বৃত্তায়ন,পরিবারতন্ত্র ও সুশাসনের অভাবে ব্যাংকিং খাত কার্যত ধ্বংস বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর
কনি/ এমএসি