USA news 24/7
Stay Ahead with the Latest in Business

তুরস্কে সৌরবিদ্যুৎ ছাড়িয়ে যেতে পারে জলবিদ্যুৎকে

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন রেকর্ড

তুরস্কে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। দেশটির মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এপ্রিল মাস শেষে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪১০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এই অগ্রগতি তুরস্ককে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের দিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির আধিপত্য

তুরস্কের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৬২.৫ শতাংশ এখন নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসছে। এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৩৭৭ মেগাওয়াট।

এছাড়া দেশীয় উৎসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার মোট বিদ্যুৎ মিশ্রণের ৭১.৭ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব ও পরিবেশবান্ধব শক্তির দিকে ঝুঁকছে তুরস্ক।

সৌরবিদ্যুতের বিস্ময়কর উত্থান

তুরস্কে সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে সৌরবিদ্যুৎ খাত। বর্তমানে দেশটির সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৭৬৯ মেগাওয়াটে, যা মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার ২১.৩ শতাংশ।

মাত্র ১৩ বছরে এই বিশাল সৌর সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদমন্ত্রী আলপারসলান বায়রাকতার।

তিনি বলেন, খুব শিগগিরই সৌরবিদ্যুৎ দেশটির সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হবে।

বায়ু বিদ্যুতেও বড় অগ্রগতি

সৌরশক্তির পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে তুরস্ক। বর্তমানে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৭৫ মেগাওয়াটে, যা মোট সক্ষমতার ১২ শতাংশ।

সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ মিলিয়ে এখন তুরস্কের মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অংশ গঠিত হয়েছে। দুই উৎসের সম্মিলিত সক্ষমতা এখন ৪১ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট।

জলবিদ্যুৎ এখনও শীর্ষে

বর্তমানে তুরস্কে সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎস হলো জলবিদ্যুৎ। এর মোট সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট, যা মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার ২৫.৮ শতাংশ।

তবে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে খুব দ্রুত এই অবস্থান বদলে যেতে পারে।

মন্ত্রী আলপারসলান বায়রাকতার জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ সৌরবিদ্যুৎ জলবিদ্যুৎকে ছাড়িয়ে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হবে।

প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার অবস্থান

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পরও তুরস্ক এখনও প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করছে।

বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার ১৩ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার ২০ শতাংশ।

দেশীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন রয়েছে ১১ হাজার ৫৬৫ মেগাওয়াট বা ৯.২ শতাংশ। অন্যদিকে আমদানিকৃত কয়লাভিত্তিক সক্ষমতা ১০ হাজার ৪৫৬ মেগাওয়াট, যা মোটের ৮.৩ শতাংশ।

অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তি

তুরস্কে বায়োমাস এবং ভূ-তাপীয় শক্তিও ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

বর্তমানে:

  • বায়োমাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট
  • ভূ-তাপীয় শক্তি থেকে উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৭৯৮ মেগাওয়াট

যদিও এদের অবদান তুলনামূলক কম, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এই খাতগুলোকে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

২০৩৫ সালের বিশাল পরিকল্পনা

তুরস্ক সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ১ লাখ ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশটি প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিনিয়োগ শুধু জ্বালানি খাত নয়, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তি উন্নয়নেও বড় প্রভাব ফেলবে।

পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে তুরস্ক

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব বাড়ছে। তুরস্কও কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গড়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

সরকারের ২০৩৫ সালের নেট-জিরো নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলে ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানি ব্যয়ও কমবে।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিশেষ অনুষ্ঠান

জ্বালানি মন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ নিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

সেখানে নতুন সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঘোষণা করা হতে পারে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন বার্তা

তুরস্কের এই অগ্রগতি বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

বিশেষ করে সৌরশক্তির খরচ কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে অনেক দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে।

তুরস্কের অভিজ্ঞতা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্যও একটি উদাহরণ হতে পারে।

তুরস্কে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ দেশটির জ্বালানি খাতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের বিস্ময়কর অগ্রগতি প্রমাণ করছে যে ভবিষ্যতের জ্বালানি হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই।

বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খুব দ্রুত জলবিদ্যুৎকে ছাড়িয়ে দেশের প্রধান বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে।

২০৩৫ সালের বিশাল পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তুরস্ক বিশ্বের অন্যতম নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সেূত্র: ডেইলি সাবাহ

Leave A Reply

Your email address will not be published.