EMail: corporatenews100@gmail.com
দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে টানাপোড়েন। ব্যাংকটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে কেন্দ্র করে একদিকে চলছে সমালোচনা ও আন্দোলন, অন্যদিকে তাকে নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের ‘রশি টানাটানি’ পরিস্থিতি।
ঋণখেলাপির অভিযোগে নতুন ব্যাখ্যা
সম্প্রতি খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ সামনে আসে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি নন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা তার স্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রতিষ্ঠানটি ঋণ খেলাপি হলেও খুরশীদ আলমকে ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি বলা আইনগতভাবে সঠিক নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যক্তির স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হওয়া মানেই সেই ব্যক্তি ঋণখেলাপি হয়ে যান না। ফলে এ ধরনের তথ্য প্রচার বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
পুরনো অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আবার আলোচনায়
খুরশীদ আলমকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি বড় কারণ তার অতীত কর্মজীবনের একটি ঘটনা। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার দুটি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করা হয়েছিল।
তবে দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশ ব্যাংক এখন দাবি করছে, সে সময় তার বিরুদ্ধে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ওই শাস্তি যথাযথ ছিল না এবং পরবর্তীতে তার পদোন্নতি পাওয়াই প্রমাণ করে যে তিনি প্রতিষ্ঠানের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে আন্দোলন
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু পক্ষ তার নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনও করছে। তাদের দাবি, অতীতের অভিযোগ এবং বিতর্কিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এই নিয়োগ পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই দাবির সঙ্গে একমত নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, যথাযথ যাচাই-বাছাই করেই তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং কোনো ধরনের চাপ বা আন্দোলনের মুখে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেই।
অনলাইন বোর্ড সভা নিয়ে ব্যাখ্যা
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনলাইনে আয়োজনের অনুমতি দেওয়াও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যাংকের আবেদনের ভিত্তিতে ভার্চুয়াল সভার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং এতে কোনো আইনি বাধা নেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, দেশের ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনলাইন সভা একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।
ইসলামী ব্যাংকের সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট দূর করা। চেয়ারম্যানকে ঘিরে বিতর্ক, পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে মতবিরোধ এবং ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কঠিন সময় পার করছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের চেয়ে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, বিতর্কের স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান ছাড়া আস্থার সংকট কাটানো কঠিন হবে।
ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি চেয়ারম্যান নিয়োগের বিতর্ক নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি, সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। খুরশীদ আলমকে নিয়ে বিতর্ক কতদূর গড়ায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক তার অবস্থানে কতটা অটল থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
করপোরেটনিউজ২৪/এইচএইচ,এসটি