EMail: corporatenews100@gmail.com
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার আরও পাঁচ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে এলএনজির দাম ও সরবরাহের ওপর। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা স্বাভাবিক রাখতে সরকার সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
কোথা থেকে আসছে এলএনজি?
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোট পাঁচ কার্গো এলএনজির মধ্যে দুই কার্গো সংগ্রহ করা হবে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায়। এই চালান আসবে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সরবরাহকারীর মাধ্যমে।
অন্যদিকে বাকি তিন কার্গো কেনা হবে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে কোটেশন সংগ্রহের মাধ্যমে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী—
- এক কার্গো সরবরাহ করবে বিপি সিঙ্গাপুর
- দুই কার্গো সরবরাহ করবে টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার
এই তিন কার্গোর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।
কেন বাড়ছে আমদানি ব্যয়?
এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজার সবসময়ই ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচল, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজারমূল্যে দ্রুত পরিবর্তন আসে।
নতুন এই ক্রয় প্রস্তাবের ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত মাসের তুলনায় আমদানি খরচ কিছুটা বেড়েছে।
এর আগে অনুমোদিত তিন কার্গো এলএনজির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। তারও আগে মে মাসে তিন কার্গো এলএনজি কিনতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা।
অর্থাৎ কয়েক দফায় এলএনজি কেনার খরচ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যচাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি?
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনো প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বর্তমানে—
- বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা
- শিল্প উৎপাদন
- সার কারখানা
- বাণিজ্যিক খাত
সব ক্ষেত্রেই গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হলে দেশের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এই কারণে প্রয়োজনীয় মজুত নিশ্চিত করতে সরকার নিয়মিতভাবে স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহ করছে।
ক্রয় কমিটির বৈঠকে আরও যেসব সিদ্ধান্ত
জ্বালানি খাত ছাড়াও সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- ৪০ হাজার টন বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার ক্রয়
- দুই জেলায় ৫৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ
- ৫০ কেজি ধারণক্ষমতার এক কোটি নতুন বি-টুইল বস্তা কেনা
এসব প্রকল্প কৃষি, শিক্ষা এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জন্য এলএনজি আমদানির ব্যয় আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হলে বিশ্ববাজারে গ্যাস ও তেলের দাম নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থায় সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—একদিকে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পাঁচ কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্তকে অনেকেই আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে দেশের জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহ পরিস্থিতি।
করপোরেটনিউজ২৪/এইচ এইচ/এসটি