EMail: corporatenews100@gmail.com
ডেস্ক রিপোর্ট : আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘ সময়ের টানা উত্থানের পর স্বর্ণের দামে বড় ধরনের সংশোধনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের বাজারকে যেসব শক্তিশালী উপাদান চাঙ্গা রেখেছিল, সেগুলোর প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। ফলে সামনে মূল্যপতনের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রয়টার্সের এশিয়া কমোডিটিজ অ্যান্ড এনার্জি বিশ্লেষক ক্লাইড রাসেলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইতিহাস বলছে স্বর্ণের বাজারে বড় উল্লম্ফনের পর সাধারণত উল্লেখযোগ্য মূল্যসংশোধন দেখা যায়। অতীতের কয়েকটি চক্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দাম যত দ্রুত বেড়েছে, পরবর্তী সময়ে তত বড় পতনের মুখেও পড়েছে মূল্যবান এই ধাতুটি।
স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে ছিল তিন বড় কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রেকর্ড মূল্য বৃদ্ধির পেছনে তিনটি প্রধান চালিকাশক্তি কাজ করেছে—
১. কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক স্বর্ণ ক্রয়
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েক বছর ধরে রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের পর স্বর্ণ কেনার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যা বাজারে দামের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।
২. চীন ও ভারতের শক্তিশালী চাহিদা
বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই স্বর্ণভোক্তা দেশ চীন ও ভারতে গহনা ও বিনিয়োগ খাতে স্বর্ণের চাহিদা দীর্ঘ সময় ধরে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এই চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
৩. বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করেছে। বিশেষ করে মার্কিন অর্থনীতি ও ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও স্বর্ণের চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
কেন কমছে স্বর্ণের চাহিদা?
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, স্বর্ণের বাজারে আগের মতো ক্রেতাদের আগ্রহ নেই। বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয় প্রবণতা কমেছে। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের গহনা বাজারেও চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে দামের লাগামহীন উত্থানের ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে স্বর্ণ। ফলে গহনা কেনার প্রবণতা কমে এসেছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে আমদানি নীতির পরিবর্তন ও কর বৃদ্ধির প্রভাবও বাজারে পড়েছে।
ইতিহাস কী বলছে?
অতীতের বাজারচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বর্ণের দাম বড় উত্থানের পর সাধারণত ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সংশোধনের মুখে পড়েছে। এরপর আবার নতুন চক্রে ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমান বাজারে আরও কিছু সময় অস্থিরতা থাকতে পারে। বিশেষ করে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদা দুর্বল থাকে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে যায়, তাহলে স্বর্ণের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
এখন কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে?
বর্তমানে স্বর্ণের বাজারের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে মার্কিন সুদের হার সংক্রান্ত প্রত্যাশা। বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখছেন।
সুদের হার কমার সম্ভাবনা তৈরি হলে স্বর্ণের দাম বাড়ে, কারণ স্বর্ণ কোনো সুদ দেয় না। অন্যদিকে সুদের হার দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ থেকে সরে গিয়ে সুদভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
সামনে কী হতে পারে?
বাজার বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, স্বর্ণের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান এখনও শক্তিশালী থাকলেও স্বল্পমেয়াদে মূল্যসংশোধনের ঝুঁকি রয়েছে। বৈশ্বিক রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের বাজার এবং মার্কিন মুদ্রানীতি—সবকিছু মিলিয়ে আগামী মাসগুলোতে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যেতে পারে।
করপোরেটনিউজ২৪/এইচ এইচ