EMail: corporatenews100@gmail.com
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে ফের পতন, কমেছে বাংলাদেশের বাজারেও
আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে আবারও চাপে পড়েছে স্বর্ণের বাজার। বিশ্ববাজারে টানা দরপতনের পর এর প্রভাব দেখা গেছে বাংলাদেশের বাজারেও। সম্প্রতি বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) স্বর্ণের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, ফলে ক্রেতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক মাস স্বর্ণের বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশ্ববাজারে কেন কমছে স্বর্ণের দাম?
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম ০.৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,৩১৩ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। এর আগে কয়েকদিন ধরেই স্বর্ণের বাজারে বিক্রির চাপ দেখা যাচ্ছিল।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা।
যখন সুদের হার বাড়ে, তখন বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বন্ড, সঞ্চয়পত্র বা অন্যান্য সুদভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের চাহিদা কমে যায়।
মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের প্রভাব
সম্প্রতি ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
স্বর্ণ কোনো সুদ দেয় না। তাই যখন নিরাপদ বিনিয়োগ থেকে ভালো রিটার্ন পাওয়া যায়, তখন অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণ বিক্রি করে অন্য সম্পদে অর্থ স্থানান্তর করেন।
এ কারণেই বিশ্ববাজারে স্বর্ণের ওপর বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।
ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ
বর্তমানে বাজারে ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যে সুদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি।
মার্কিন শ্রমবাজার এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং মূল্যস্ফীতিও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামেনি। ফলে ফেডের নীতিনির্ধারকরা কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে পারেন।
এটি স্বর্ণের জন্য নেতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করছে।
ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সামরিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলারের বেশি বেড়েছে।
সাধারণত যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকটের সময় স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এবার উচ্চ সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা সেই সুবিধাকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও স্বর্ণের দাম বাড়ার পরিবর্তে কমেছে।
বাংলাদেশেও কমেছে স্বর্ণের দাম
বিশ্ববাজারের এই দরপতনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের স্বর্ণের বাজারে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সর্বশেষ এক ভরি স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৪৮২ টাকা কমিয়েছে।
এর ফলে বর্তমানে দেশের বাজারে:
২২ ক্যারেট স্বর্ণ
- প্রতি ভরি: ২ লাখ ২৯ হাজার ৩৭৩ টাকা
২১ ক্যারেট স্বর্ণ
- প্রতি ভরি: ২ লাখ ১৮ হাজার ৯৩৩ টাকা
১৮ ক্যারেট স্বর্ণ
- প্রতি ভরি: ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৪ টাকা
সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ
- প্রতি ভরি: ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৫৭ টাকা
এই নতুন মূল্য ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে এবং দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে একই দাম অনুসরণ করা হচ্ছে।
কয়েক দিনের মধ্যেই দ্বিতীয়বার কমল দাম
এটি স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক সময়ের দ্বিতীয় বড় সমন্বয়।
এর আগে জুন মাসের শুরুতেও বাজুস স্বর্ণের দাম কমিয়েছিল। তখন প্রতি ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমানো হয়েছিল।
দুই দফা সমন্বয়ের ফলে স্বর্ণের বাজারে উল্লেখযোগ্য মূল্যহ্রাস দেখা গেছে।
কেন দাম কমিয়েছে বাজুস?
বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা বিশুদ্ধ স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ার কারণে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই তারা নিয়মিত স্বর্ণের দাম সমন্বয় করে থাকে।
চলতি বছরে কতবার বদলেছে স্বর্ণের দাম?
২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম পরিবর্তনের সংখ্যা নজিরবিহীন।
বছরের শুরু থেকে:
- মোট ৭১ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছে
- ৩৭ বার দাম বেড়েছে
- ৩৪ বার দাম কমেছে
এ থেকে বোঝা যায় যে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের অস্থিরতা দেশের বাজারেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এখন কি স্বর্ণ কেনার ভালো সময়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আগামী কয়েক মাসে মার্কিন সুদের হার, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর স্বর্ণের ভবিষ্যৎ মূল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।
যদি যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার আরও বাড়ে, তাহলে স্বর্ণের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। আবার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা হঠাৎ বাড়তেও পারে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং বন্ডের উচ্চ ফলন। এর প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়েছে, ফলে কমেছে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম।
বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ২৯ হাজার ৩৭৩ টাকা। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী সপ্তাহগুলোতে স্বর্ণের বাজারে আরও ওঠানামা দেখা যেতে পারে।
যারা স্বর্ণে বিনিয়োগ বা অলংকার কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কর