EMail: corporatenews100@gmail.com
রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন গতি, জুনের প্রথম ৬ দিনেই দেশে এলো ৮ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের জুন মাসের শুরুতেই সুখবর দিয়েছে এই খাত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের প্রথম ছয় দিনে দেশে এসেছে ৬৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা।
হিসাব করলে দেখা যায়, এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকারও বেশি প্রবাসী আয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে জুন মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ নতুন রেকর্ডও স্পর্শ করতে পারে।
জুনের প্রথম সপ্তাহেই শক্তিশালী সূচনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ পাঠিয়ে যাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং অন্যান্য দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
জুনের প্রথম ছয় দিনের রেমিট্যান্স প্রবাহ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহারের প্রবণতা আগের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
কোন ধরনের ব্যাংকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্স গ্রহণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।
বেসরকারি ব্যাংক
- রেমিট্যান্স এসেছে: ৪১ কোটি ৪৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক
- রেমিট্যান্স এসেছে: ১৩ কোটি ৯০ লাখ ৭০ হাজার ডলার
বিশেষায়িত ব্যাংক
- রেমিট্যান্স এসেছে: ১২ কোটি ৭৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার
বিদেশি ব্যাংকের শাখা
- রেমিট্যান্স এসেছে: ২৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার
পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে দেশের মোট রেমিট্যান্সের বড় অংশ এখনও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই দেশে আসছে।
সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে কোন ব্যাংক?
জুন মাসের প্রথম ছয় দিনে প্রবাসী আয় গ্রহণে শীর্ষে রয়েছে Islami Bank Bangladesh PLC।
ব্যাংকটির মাধ্যমে এসেছে:
- ১২ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার
এটি দেশের সব ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
দ্বিতীয় স্থানে
Bangladesh Krishi Bank
- ১২ কোটি ৭৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার
তৃতীয় স্থানে
Agrani Bank PLC
- ১০ কোটি ১৩ লাখ ডলার
চতুর্থ স্থানে
BRAC Bank PLC
- ৬ কোটি ২৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার
এই চারটি ব্যাংক দেশের মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের বড় অংশ পরিচালনা করেছে।
কেন বাড়ছে রেমিট্যান্স?
বিশ্লেষকদের মতে কয়েকটি কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
১. বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে প্রবাসীরা এখন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।
২. প্রণোদনা সুবিধা
রেমিট্যান্সের ওপর সরকারি প্রণোদনা এখনও প্রবাসীদের জন্য আকর্ষণীয়।
৩. বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার তৈরি হওয়ায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পেয়েছে।
৪. ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা
মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন রেমিট্যান্স সেবার কারণে অর্থ পাঠানো এখন অনেক সহজ ও দ্রুত হয়েছে।
১১টি ব্যাংকে আসেনি কোনো রেমিট্যান্স
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের প্রথম ছয় দিনে দেশি-বিদেশি মোট ১১টি ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি।
এর মধ্যে রয়েছে:
- বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক
- রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক
- কমিউনিটি ব্যাংক
- আইসিবি ইসলামী ব্যাংক
- পদ্মা ব্যাংক
এছাড়াও কয়েকটি বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমেও কোনো প্রবাসী আয় আসেনি।
এই তথ্য ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স সেবার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব
রেমিট্যান্স শুধু প্রবাসী পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করে না, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রেমিট্যান্সের মাধ্যমে:
- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়
- আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হয়
- ডলারের বাজার স্থিতিশীল থাকে
- গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ প্রবাহ বাড়ে
- দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখে
বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
জুন মাসে নতুন রেকর্ডের সম্ভাবনা?
জুনের প্রথম ছয় দিনের প্রবাহ যদি একই গতিতে চলতে থাকে, তাহলে পুরো মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঈদ-পরবর্তী সময়েও প্রবাসীরা নিয়মিত অর্থ পাঠিয়ে গেলে জুন মাস দেশের রেমিট্যান্স ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী মাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
জুন ২০২৬-এর প্রথম ছয় দিনেই দেশে এসেছে ৬৮.৩৩ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার সমান। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকারও বেশি প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে, এরপর রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক। শক্তিশালী এই রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।