EMail: corporatenews100@gmail.com
বাংলাদেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন এক মাইলফলক যুক্ত হয়েছে। এবার ‘হ্যাচিং এগ’ রপ্তানি করে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে দেশ। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার ৪৪০টি হ্যাচিং এগ বা বাচ্চা উৎপাদনক্ষম ডিম পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় পাঠানো হয়েছে। এই চালান দেশের পোল্ট্রি শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রোববার (২৮ জুন) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ থেকে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ডিমের চালানটি পাঠানো হয়। রপ্তানিকৃত ডিমগুলো ‘রস ৩০৮ ব্রয়লার’ (Ross 308 Broiler Parent Hatching Eggs) জাতের, যা আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চমানের ব্রয়লার উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
কাজী ফার্মসের নতুন সাফল্য
দেশের শীর্ষ পোল্ট্রি প্রতিষ্ঠান কাজী ফার্মস গ্রুপ এই রপ্তানি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। পঞ্চগড়ে অবস্থিত তাদের ব্রয়লার গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ফার্মে আন্তর্জাতিক মানের কঠোর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা অনুসরণ করে এসব হ্যাচিং এগ উৎপাদন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন হওয়ায় বাংলাদেশের পোল্ট্রি পণ্য বিদেশি বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাই এবার ‘হ্যাচিং এগ’ রপ্তানি দেশের কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
কত আয় হবে এই রপ্তানি থেকে?
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম চালানে মোট ১০ হাজার ৪৪০টি হ্যাচিং এগ রপ্তানি করা হয়েছে। এই চালান থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৮ হাজার ৭২৯ মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে।
যদিও এটি পরীক্ষামূলক রপ্তানি, তবে সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বিভিন্ন দেশে নিয়মিত হ্যাচিং এগ রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের প্রত্যাশা
রপ্তানি কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, সরকার দেশের প্রতিটি উৎপাদনশীল খাতকে রপ্তানিমুখী হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। প্রাণিসম্পদ খাতও ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
তার ভাষায়, দেশের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হওয়া শুধু অর্থনৈতিক অর্জন নয়, বরং আন্তর্জাতিক মান অর্জনেরও স্বীকৃতি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এই রপ্তানির পরিধি আরও বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রাণিসম্পদ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বক্তব্য
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বলেন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রাণিসম্পদ খাত গড়ে তুলতে সরকার ও অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। হ্যাচিং এগ রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন পরিচিতি পাবে।
তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগ সরকারের রপ্তানি বহুমুখীকরণ কৌশল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভবিষ্যতে টেবিল ডিমও রপ্তানির পরিকল্পনা
কাজী ফার্মস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান জানান, পরীক্ষামূলক চালান সফল হলে ভবিষ্যতে শুধু হ্যাচিং এগ নয়, খাদ্যোপযোগী বা টেবিল ডিমও আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়মিত রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ডিম উৎপাদনকারী খামারিদের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি হবে এবং পোল্ট্রি শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে নতুন সম্ভাবনা
বর্তমানে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প দেশের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস। ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে এই খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিতভাবে এবার ‘হ্যাচিং এগ’ রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পোল্ট্রি পণ্যের চাহিদা তৈরি হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই রপ্তানি?
হ্যাচিং এগ সাধারণ ডিম নয়। এগুলো থেকে উন্নত জাতের ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা উৎপাদন করা হয়। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে এসব ডিমের চাহিদা অনেক বেশি। বাংলাদেশ প্রথমবার এই বাজারে প্রবেশ করতে পেরেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এছাড়া কৃষিভিত্তিক রপ্তানি পণ্যের তালিকায় নতুন একটি খাত যুক্ত হওয়ায় দেশের রপ্তানি আয়ও আরও বৈচিত্র্যময় হবে।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন। এবার ‘হ্যাচিং এগ’ রপ্তানি শুধু একটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ। পরীক্ষামূলক এই চালান সফল হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশে হ্যাচিং এগ ও অন্যান্য প্রাণিসম্পদ পণ্য রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
করপোরেটনিিউজ২৪/ এসটি