EMail: corporatenews100@gmail.com
অনলাইন ডেস্ক: দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপকে ঋণখেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত গ্রুপটির বিদ্যমান ঋণের শ্রেণিকরণ অপরিবর্তিত থাকবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে সিটি গ্রুপকে তাৎক্ষণিকভাবে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে না এবং ঋণদাতা ব্যাংকগুলোও বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় তাদের সঙ্গে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।
সিটি গ্রুপের মোট ঋণ কত?
তথ্য অনুযায়ী, দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ ২৪ হাজার ১৮৪ কোটি টাকার বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়িক চাপ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির নগদ প্রবাহে সংকট তৈরি হয়েছে।
কেন এই বিশেষ সুবিধা?
সিটি গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করে জানায়, গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাদের ব্যবসায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে—
- ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন
- আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি
- দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়া
- এলসি খোলার জটিলতা
- উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি
- নগদ প্রবাহে সংকট
এসব কারণে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩৭টি ব্যাংককে পাঠানো চিঠিতে জানিয়েছে, সিটি গ্রুপের ঋণের বর্তমান শ্রেণিকরণ আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখা যাবে।
তবে ব্যাংকগুলোকে কয়েকটি শর্তও মানতে হবে। যেমন—
- প্রয়োজনীয় প্রভিশন (Provision) সংরক্ষণ করতে হবে।
- প্রকৃত অর্থ আদায় না হলে সুদকে আয় হিসেবে দেখানো যাবে না।
- ব্যাংকার ও গ্রাহকের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
কেন উদ্বিগ্ন ব্যাংকগুলো?
আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের বেশি ঋণ বকেয়া থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণখেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করতে হয়। একবার খেলাপি হয়ে গেলে নতুন ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
সিটি গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী খেলাপি হলে—
- ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেত।
- বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে হতো।
- নতুন অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারত।
- শিল্প উৎপাদনেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকত।
এ কারণেই ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকেও সাময়িক নীতিগত সহায়তার পক্ষে মত দেওয়া হয়।
সাত ধরনের নীতিগত সহায়তা চেয়েছে সিটি গ্রুপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দেওয়া আবেদনে প্রতিষ্ঠানটি কয়েকটি বিশেষ সুবিধা চেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণখেলাপি ঘোষণা স্থগিত রাখা।
- বিদ্যমান ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা চালু রাখা।
- অতিরিক্ত কার্যকরী মূলধনের ব্যবস্থা।
- এলসি খোলায় বিশেষ সুবিধা।
- জরিমানা সুদ মওকুফের অনুরোধ।
- পুনঃতফসিলে সহজ শর্ত।
- বড় ঋণগ্রহীতার সীমা কিছুটা শিথিল করা।
আর্থিক চাপে পড়ার কারণ কী?
সিটি গ্রুপ জানিয়েছে, গত চার বছরে ব্যবসায়িক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে—
- ডলারের মূল্য অনেক বেড়েছে।
- বিদেশি ঋণের সুদ প্রায় তিনগুণ হয়েছে।
- ব্যাংকে ডলারের সংকটে এলসি খুলতে বিলম্ব হচ্ছে।
- আন্তর্জাতিক ব্যাংকের কনফার্মেশন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর ফলে কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদন কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়েছে।
হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিনিয়োগও চাপে ফেলেছে
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে সিটি গ্রুপ কয়েকটি বড় শিল্পকারখানায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
তবে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় এসব কারখানার পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রত্যাশিত আয় না আসায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে।
ব্যাংকারদের মতামত
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, তিন মাস সময় দেওয়া হলেও শুধু ঋণের শ্রেণিকরণ স্থগিত রাখলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
তাদের মতে—
- উৎপাদন দ্রুত স্বাভাবিক করতে হবে।
- ব্যবসার নগদ প্রবাহ বাড়াতে হবে।
- পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
- প্রয়োজনে অলস সম্পদের ব্যবহার বা বিক্রির মাধ্যমে ঋণের চাপ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
কোন ব্যাংকের কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণ?
সিটি গ্রুপের বড় ঋণদাতাদের মধ্যে রয়েছে
এইচএসবিসি
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড
সিটি ব্যাংক
ইউসিবি
ইস্টার্ন ব্যাংক
পূবালী ব্যাংক
প্রাইম ব্যাংক
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক
ব্র্যাক ব্যাংক
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক
ব্যাংক এশিয়া
এনসিসি ব্যাংক
ইসলামী ব্যাংক
সাউথইস্ট ব্যাংক
ঢাকা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি দেশি ও বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, সিটি গ্রুপের সংকট নিরসনে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে আর্থিক স্থিতিশীলতায় ফিরতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের বোঝা নিয়ে আর্থিক চাপে রয়েছে সিটি গ্রুপ। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণখেলাপি না করার সুযোগ দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ঋণ পুনর্গঠন, ব্যবসা পুনরুদ্ধার এবং নগদ প্রবাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য কার্যকর পুনর্গঠন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এস.টি/ এস.জি.এন