EMail: corporatenews100@gmail.com
বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী কয়েক বছরে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারের অংশ কমিয়ে সোনা এবং অন্যান্য বিকল্প মুদ্রার পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রথমবারের মতো ডলার রিজার্ভ বাড়ানোর চেয়ে কমানোর আগ্রহই বেশি প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো।
ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা কেন?
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান OMFIF-এর জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে “ডি-ডলারাইজেশন” বা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—
- বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার বাড়া
- যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তা
- রিজার্ভে ঝুঁকি বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ডলারের ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে আর্থিক ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন একাধিক নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
জরিপে কী উঠে এসেছে?
চলতি বছরের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে বিশ্বের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়।
মূল তথ্যগুলো হলো—
- প্রথমবারের মতো ডলার রিজার্ভ কমানোর আগ্রহ বাড়ানোর চেয়ে বেশি।
- অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ১০ বছরে রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনতে চায়।
- ডলারের পাশাপাশি ইউরো, চীনের রেনমিনবি এবং সোনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
- বিকল্প মুদ্রা হিসেবে সিঙ্গাপুর ডলার, দক্ষিণ কোরিয়ার ওন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার রান্ডও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
ডলারের আধিপত্য কি শেষ হয়ে যাচ্ছে?
এখনই এমনটি বলা যাবে না।
বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সবচেয়ে বড় অংশ এখনও মার্কিন ডলারেই রয়েছে। গত পাঁচ বছরেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট রিজার্ভের প্রায় ৫৮ শতাংশ ডলারে সংরক্ষিত ছিল।
তবে ধীরে ধীরে ডলারের একচ্ছত্র প্রভাব কমে আসছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
ইউরো ও রেনমিনবির গুরুত্ব বাড়ছে
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় সব কেন্দ্রীয় ব্যাংকই মনে করেছে, চীনের রেনমিনবি ভবিষ্যতে রিজার্ভ বৈচিত্র্য আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউরোর গ্রহণযোগ্যতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জরিপ অনুযায়ী—
- প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইউরোকে আগের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে করছে।
- দীর্ঘমেয়াদে ইউরো রিজার্ভ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে প্রায় ২৯ শতাংশ ব্যাংক।
এতে বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রিজার্ভ ব্যবস্থায় একাধিক শক্তিশালী মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
কেন বাড়ছে সোনার চাহিদা?
বর্তমানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে সোনার বাজারে।
ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার ওপর বেশি আস্থা রাখছে।
গত এক বছরে সোনার দাম ২০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেলেও বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনা কেনা অব্যাহত রেখেছে।
রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে সোনা এখন শীর্ষে
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট রিজার্ভ সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশ এখন সোনা।
পরিসংখ্যান বলছে—
- মোট রিজার্ভ সম্পদের প্রায় ২৭ শতাংশ এখন সোনা।
- মার্কিন ট্রেজারির অংশ কমে প্রায় ২২ শতাংশে নেমেছে।
- ইউরোর অংশ প্রায় ১৫ শতাংশে স্থির রয়েছে।
এটি দেখায় যে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
কেন সোনা কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো?
বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মতে, সোনা কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ—
- ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দেয়।
- অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় মূল্য ধরে রাখে।
- কোনো দেশের নীতির ওপর নির্ভরশীল নয়।
- দীর্ঘমেয়াদে রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমায়।
জরিপে অংশ নেওয়া ৫১ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিই সোনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রধান কারণ।
ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলারের গুরুত্ব পুরোপুরি কমে যাবে না। তবে আগামী দশকে বৈশ্বিক রিজার্ভ আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে।
এর ফলে—
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একাধিক মুদ্রার ব্যবহার বাড়বে।
- সোনার চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
- ডলারের একক আধিপত্য কিছুটা কমতে পারে।
- বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক বিনিয়োগ কৌশল স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে তারা এখন নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় রিজার্ভ গঠনে গুরুত্ব দিচ্ছে। ডলার এখনও বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী রিজার্ভ মুদ্রা হলেও, সোনা, ইউরো এবং রেনমিনবির প্রতি বাড়তে থাকা আগ্রহ ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী বছরগুলোতে এই প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতি, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
১ ডলার সমান কত টাকা ,আমেরিকার স্বর্ণের দাম কত
- ১ মার্কিন ডলার (USD) ≈ ১২৩.২৪ বাংলাদেশি টাকা (BDT)। বিনিময় হার ব্যাংক, মানি এক্সচেঞ্জ ও রেমিট্যান্স সেবাভেদে সামান্য ভিন্ন হতে পারে।
- যুক্তরাষ্ট্রে স্বর্ণের স্পট মূল্য (Gold Spot Price) প্রায় ৪,০৯০ মার্কিন ডলার প্রতি ট্রয় আউন্স (Troy Ounce), অর্থাৎ প্রতি গ্রাম প্রায় ১৩১.৫ ডলার। এটি আন্তর্জাতিক বাজারের স্পট মূল্য; গয়না বা স্বর্ণের বার কিনতে গেলে প্রিমিয়াম, কর ও বিক্রেতার চার্জ যোগ হয়