EMail: corporatenews100@gmail.com
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী শিল্প, পরিচিত ‘কে-বিউটি’ নামে, এখন আর কেবল সৌন্দর্যচর্চার ট্রেন্ড নয়—এটি পরিণত হয়েছে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক খাতে। শামুকের নির্যাস থেকে শুরু করে চাল ধোয়া পানির মতো ব্যতিক্রমী উপাদান ব্যবহার করে কোরিয়ান স্কিনকেয়ার পণ্যগুলো আজ বিশ্বের কোটি মানুষের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী রফতানি আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। এই প্রবৃদ্ধির ফলে ফ্রান্সকে ছাড়িয়ে দেশটি এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রসাধনী রফতানিকারক, যেখানে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কে-পপ ও কে-ড্রামার বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা কোরিয়ান প্রসাধনী শিল্পের জন্য বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ২০২৪ সালে দেশটির অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যপণ্যের বাজারের মূল্য ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কে-বিউটির সাফল্যের অন্যতম কারণ তাদের দ্রুত পণ্য উন্নয়ন ব্যবস্থা। পশ্চিমা দেশগুলোর বড় ব্র্যান্ড যেখানে নতুন পণ্য বাজারে আনতে এক থেকে তিন বছর সময় নেয়, সেখানে কোরিয়ান ব্র্যান্ডগুলো ছয় মাসের মধ্যেই গবেষণা থেকে দোকানের তাক পর্যন্ত পণ্য পৌঁছে দিতে সক্ষম হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার বিউটি ব্র্যান্ড সক্রিয় রয়েছে, যা একটি সুসংগঠিত শিল্প কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কসম্যাক্সের মতো উৎপাদন প্রতিষ্ঠান বিশ্বজুড়ে সাড়ে চার হাজারের বেশি ব্র্যান্ডের জন্য ফর্মুলা ও পণ্য তৈরি করছে। অন্যদিকে, আমোরেপ্যাসিফিকের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলো স্বয়ংক্রিয় কারখানার মাধ্যমে বিশাল চাহিদা পূরণ করছে।
একসময় চীন ছিল কোরিয়ান প্রসাধনীর প্রধান বাজার। তবে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং চীনের নিজস্ব ব্র্যান্ডগুলোর উত্থানের কারণে কোরিয়ান কোম্পানিগুলো এখন নতুন বাজারের দিকে নজর দিচ্ছে। আমোরেপ্যাসিফিকের প্রধান নির্বাহী কিম সেউং-হোয়ান জানিয়েছেন, গত বছর প্রথমবারের মতো উত্তর আমেরিকায় তাদের ব্যবসা চীনের চেয়ে বড় হয়েছে। বর্তমানে জাপান, ইউরোপ ও ভারতের মতো বাজারগুলোতে সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে তারা। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ১৫ শতাংশ আমদানিশুল্ক ভবিষ্যৎ রফতানিতে কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম, কে-বিউটির জনপ্রিয়তা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ‘গ্লাস স্কিন’ বা কাঁচের মতো স্বচ্ছ ত্বকের ধারণা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত স্কিনকেয়ার কন্টেন্ট সৌন্দর্য নিয়ে অযথা উদ্বেগ এবং বাড়তি খরচের প্রবণতা বাড়াতে পারে।
এই খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার কে-বিউটিকে ‘কৌশলগত জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে গবেষণা ও রফতানিতে বিশেষ কর ছাড় ও নীতিগত সহায়তা পাচ্ছে শিল্পটি।
সব মিলিয়ে, কে-বিউটি এখন আর সাময়িক ট্রেন্ড নয়; এটি দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। লরিয়ালের মতো আন্তর্জাতিক প্রসাধনী জায়ান্টদের কোরিয়ান কোম্পানি অধিগ্রহণের প্রবণতাই প্রমাণ করে—বিশ্ব সৌন্দর্য শিল্পের ভবিষ্যৎ ক্রমেই সিউলের দিকেই ঝুঁকছে।
করপোরেটনিউজ২৪, এইচএইচ