Corporate & Business News Bangladesh
Corporate Bangladesh Corporate Bangladesh Corporate News Bangladesh Company News CEO Interview Business Leadership

হরমুজ খুললেই গ্যাসের বন্যা! কাতারের বড় ঘোষণা

দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে চায় কাতার

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) রপ্তানিকারক দেশ কাতার হরমুজ প্রণালি পুনরায় নিরাপদভাবে চালু হওয়ার পর দ্রুত গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান QatarEnergy ইতোমধ্যে তাদের ক্রেতাদের জানিয়েছে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদন পুনরুদ্ধার শুরু করা হবে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর। কারণ গত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার কারণে বৈশ্বিক LNG সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

এক মাসে ৫০ শতাংশ উৎপাদন ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা

QatarEnergy-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল পুনরায় শুরু হলে এক মাসের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি তাদের LNG উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ পুনরুদ্ধার করতে পারবে।

এরপর পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে দুই মাসের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৮০ শতাংশ পুনরায় চালু করার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে এই পরিকল্পনা পুরোপুরি নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকে কি না, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় বিষয়।

কেন কমে গিয়েছিল কাতারের LNG উৎপাদন?

চলতি বছরের মার্চ মাসে কাতার LNG উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে রাস লাফান (Ras Laffan) LNG কমপ্লেক্সে। এটি শুধু কাতারের নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক LNG উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

এই স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববাজারে LNG সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। ফলে এর ক্ষতি সরাসরি আন্তর্জাতিক গ্যাসবাজারে প্রভাব ফেলেছে।

বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা

QatarEnergy-এর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাস লাফান কমপ্লেক্সের ক্ষতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর সম্পূর্ণ মেরামত করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

ফলে উৎপাদনের একটি অংশ দ্রুত চালু করা সম্ভব হলেও পুরো সক্ষমতা ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি LNG চুক্তিতে ফোর্স মাজিউর

উৎপাদন সংকটের কারণে QatarEnergy তাদের কিছু দীর্ঘমেয়াদি LNG সরবরাহ চুক্তিতে “Force Majeure” ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।

Force Majeure এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কারণে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হয় না।

এ কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক LNG ক্রেতা বিকল্প সরবরাহ উৎস খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।

ইউরোপ ও এশিয়ার গ্যাসবাজারে অস্থিরতা

মধ্যপ্রাচ্যের LNG সংকটের কারণে গত তিন মাসে ইউরোপ এবং এশিয়ার গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সাধারণত শীতকাল শেষ হওয়ার পর এবং গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদা শুরু হওয়ার আগে গ্যাসের বাজার তুলনামূলক শান্ত থাকে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।

সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে LNG ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

বিশেষ করে ইউরোপ, যা রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে, তারা কাতারের LNG সরবরাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় বাজারে স্বস্তি

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নতুন সমঝোতার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।

এই ঘোষণার পর ইউরোপের বেঞ্চমার্ক গ্যাসের দাম একদিনেই প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়। গত পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে এটি ছিল সর্বনিম্ন মূল্যস্তর।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন আশা করছেন যে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ থাকবে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে LNG সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল ও LNG এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে।

বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এবং কাতারের অধিকাংশ LNG রপ্তানি এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।

ফলে এখানে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বা নিরাপত্তা সংকট সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের জন্য কী প্রভাব পড়তে পারে?

বাংলাদেশও LNG আমদানিনির্ভর দেশগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর মূল্যবৃদ্ধি হলে দেশের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়।

অন্যদিকে কাতার উৎপাদন বাড়াতে পারলে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম স্থিতিশীল হতে পারে। এতে বাংলাদেশসহ LNG আমদানিকারক দেশগুলো কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় নিরাপদভাবে চালু হলে দ্রুত LNG উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত কাতার। যদিও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর পুরোপুরি পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে, তবুও আগামী কয়েক মাসের মধ্যে উৎপাদনের বড় অংশ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং LNG আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য কাতারের এই পদক্ষেপ আগামী মাসগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।

কিরপোরেট নিউজ২৪/ এইচ এইচ

Leave A Reply

Your email address will not be published.